মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যাচ্ছে বাংলাদেশ
বাংলা টাইমস ডেস্ক:
মুসলিম বিশ্বের ঐতিহাসিক সামরিক জোট ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’-এ যোগদানের বিষয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, সরকারি মহল, বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষ অভূতপূর্ব ঐক্য প্রদর্শন করছেন। সরকার, বিরোধী দল ও জনসাধারণ: সব পক্ষই এ প্যাক্টকে বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে করছেন। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের দীর্ঘদিনের ‘চোখ রাঙানি’ ও বাংলাদেশকে ‘ছোট করার’ অপচেষ্টার বিরুদ্ধে এ জোট বাংলাদেশের জন্য এক শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করবে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন। মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হবে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব: সবার কণ্ঠেই এখন একই সুর, এ জোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আরো সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ করবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে ইরানের বিরুদ্ধে সউদী আরব যেতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. এম শহীদুজ্জামান বলেছেন, মুসলিম বিশ্বে নিজেকে রাখতে এক সময় ইরানও মক্কা প্যাক্টে ক্রিয়াশীল পার্টনার হতে পারে।
মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের যোগদান নিয়ে ভারতকে অহেতুক আতঙ্কিত না হওয়ার বার্তা দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট কোনো হুমকি নয়, আত্মরক্ষা। এতে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এ প্যাক্ট মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা কাউকে হুমকি দেয়ার জন্য নয়; বরং আত্মরক্ষার বিষয়। এতে ভারতসহ কারো বিচলিত-উৎকন্ঠিত হওয়ার কারণ নেই।
গতকাল সচিবালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঢাকায় কর্মরত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি জানিয়েছেন, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানে ইরান চিন্তিত নয়। তিনি বলেছেন, ‘তাই বাংলাদেশের কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের চিন্তিত করে না। আমরা মক্কা চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো চুক্তি মনে করি না। তবে এই মক্কা চুক্তি আসলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার দুর্বলতার একটি লক্ষণ। আমাদের সউদী আরবের সঙ্গে কোনো চ্যালেঞ্জ বা বিরোধিতা নেই। তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের খুব ভালো বন্ধু’।
বিশ্ব রাজনীতি এখন মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের দিকে। গত ১ সেপ্টেম্বর জোটের বৈঠক হয়েছে। জোটের কৌশলগত, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা-বিষয়ক কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, এ জোট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখ-তার প্রতি সম্মান এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার মতো আন্তর্জাতিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বৈঠকে জোট সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটি মিসরসহ অন্য দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত। ইতোমধ্যেই জোটের সদস্য হতে মিসর, বাংলাদেশসহ কয়েকটি মুসলিম দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বিশ্ব ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির জন্য মুসলিম দেশগুলোর ঐকবদ্ধতা তথা মক্কা প্রতিরক্ষা জোট খুবই অপরিহার্য। মক্কা প্যাক্টের ইতিহাস অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সউদী আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মক্কার আল-সাফা প্রাসাদে তুরস্ককে যুক্ত করে এই জোটের চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়া হয়। এ জোটে রয়েছে তুরস্ক (ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি) সউদী আরব, (বিশ্বের শীর্ষ তেলসমৃদ্ধ অর্থনৈতিক শক্তি) এবং পাকিস্তান (মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র)। এ তিনটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত জোটের মূল নীতি হলো: যেকোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা সব সদস্যের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে এবং তারা যৌথভাবে প্রতিরক্ষা করবে। এই নীতি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে বহুমাত্রিকভাবে সুরক্ষিত করবে।
সরকারি পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে স্পষ্ট করে বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটা ব্যবস্থা এবং এটা আমাদের মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এই জোটে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি সদস্য দেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করছে এবং তিনি এর পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ২৪ ও ৩০ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জানান যে, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের কোনো ঝুঁকি নেই। ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হওয়া; বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয় এবং সরকার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিংয়ে বলেন, মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে এবং দেশের জন্য অমঙ্গল হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান ৩১ আগস্ট তার প্রকাশিত মতামতে জানান যে, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং এর প্রভাবগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করে সরকার এ জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি এ জোটের প্রতি সরকারের আগ্রহের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ বার্তায় সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছেন। তিনি মক্কা প্রতিরক্ষা জোটকে একটি সার্বভৌম এবং অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে এমন আত্মরক্ষামূলক জোট গঠন খুবই স্বাভাবিক এবং এতে বাইরের কোনো পক্ষের বিরক্ত হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তাঁর মতে, এই জোট বাংলাদেশের স্বার্থেই কাজ করবে এবং এটি দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। তিনি আরো বলেন, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেই বিশ্বদরবারে ইসলামি দেশগুলোর অবস্থান আরো সুদৃঢ় হবে এবং বাংলাদেশ সেই ঐক্যের অংশ হয়ে গর্বিত হবে। তাঁর এই বক্তব্য বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও এই জোটের প্রতি পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।







