পরিবারসহ উচ্চশিক্ষার সুযোগ ১৪ দেশে, কোন দেশে কেমন নিয়ম ও কাজের সুযোগ?

Bangla Times Desk:

বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা বিবাহিত শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়গুলোর একটি হলো—পড়াশোনার সময় স্ত্রী, স্বামী বা সন্তানকে সঙ্গে নেওয়া যাবে কি না। অনেক দেশেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট শর্তে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে দেশভেদে ডিপেন্ডেন্ট ভিসা, রেসিডেন্স পারমিট এবং পরিবারের সদস্যদের কাজের অধিকারে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং ও চীনের মতো দেশের পারিবারিক ভিসা ব্যবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া: উচ্চশিক্ষায় তুলনামূলক সুবিধা

অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট শর্তে স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ পান। পরিবারের সদস্যদের মূল ভিসা আবেদনের সময় অন্তর্ভুক্ত করা যায়, আবার পরবর্তীতেও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের স্বামী বা স্ত্রী কাজের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা পান। অন্যদিকে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গীর কাজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা প্রযোজ্য হতে পারে।

কানাডা: যোগ্য শিক্ষার্থীর সঙ্গীর জন্য ওয়ার্ক পারমিট

কানাডাও পরিবারসহ উচ্চশিক্ষার জন্য জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর একটি। যোগ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বামী বা স্ত্রী ওপেন ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

মূল শিক্ষার্থীর স্টাডি পারমিটের মেয়াদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সঙ্গীর ওয়ার্ক পারমিট দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে কোন শিক্ষার্থী ও কোন প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট সময়ের কানাডিয়ান অভিবাসন নীতির ওপর নির্ভর করে।

জার্মানি: পরিবার নিতে প্রয়োজন একাধিক শর্ত

জার্মানিতে অন্তত এক বছর মেয়াদি কোর্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিতে পারেন।

এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা, উপযুক্ত বাসস্থান, বৈধ বিবাহের প্রমাণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সঙ্গীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ের জার্মান ভাষা জ্ঞানের প্রমাণ প্রয়োজন হতে পারে।

যোগ্য সঙ্গীরা কাজের অনুমতিও পেতে পারেন।

ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ড: পরিবার নিয়ে যাওয়ার সুযোগ

ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য তুলনামূলকভাবে সহায়ক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।

ডেনমার্কে প্রয়োজনীয় রেসিডেন্স পারমিট পাওয়ার পর শিক্ষার্থীর সঙ্গী কাজ করার সুযোগ পেতে পারেন। ফলে পরিবারসহ পড়াশোনা ও জীবনযাপনের পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীদের কাছে দেশটি আকর্ষণীয় হতে পারে।

সুইডেন ও নিউজিল্যান্ড

সুইডেন এবং নিউজিল্যান্ডেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের জন্য রেসিডেন্স পারমিটের ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে পরিবারের সদস্যের কাজের অধিকার, ভিসার ধরন এবং যোগ্যতা নির্ভর করে শিক্ষার্থীর কোর্স, ভিসার ধরন ও সংশ্লিষ্ট দেশের বর্তমান অভিবাসন নীতির ওপর।

নেদারল্যান্ডস: পরিবার যেতে পারলেও কাজের নিয়ম আলাদা

নেদারল্যান্ডসে শিক্ষার্থীর সঙ্গী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার সুযোগ থাকলেও সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজের অধিকার নিশ্চিত করে না।

অর্থাৎ পরিবার নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও সঙ্গী চাকরি করতে চাইলে আলাদা নিয়ম ও অনুমতির বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

যুক্তরাজ্য: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কঠোর হয়েছে নিয়ম

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য যুক্তরাজ্য। তবে পরিবার নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়ম কঠোর করেছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর নীতির অধীনে সাধারণ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা আগের মতো সহজে স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নিতে পারেন না। মূলত পিএইচডি বা অন্যান্য ডক্টরাল প্রোগ্রাম এবং নির্দিষ্ট গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীরা ডিপেন্ডেন্ট নেওয়ার সুযোগ পান।

এ ছাড়া নির্দিষ্ট শর্তে সরকারি বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও পরিবারের সদস্যদের নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র: F-1 শিক্ষার্থীর পরিবার F-2 ভিসায় যেতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রে F-1 স্টুডেন্ট ভিসায় পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীর স্বামী বা স্ত্রী এবং ২১ বছরের কম বয়সী অবিবাহিত সন্তান F-2 ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—F-2 ভিসাধারী স্বামী/স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি করার অনুমতি পান না। তাই পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়ার আগে জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের বিষয়টি ভালোভাবে পরিকল্পনা করা জরুরি।

সিঙ্গাপুর: নিয়ম তুলনামূলক কঠোর

সিঙ্গাপুরে অধিকাংশ স্নাতক ও সাধারণ স্নাতকোত্তর কোর্সের শিক্ষার্থীরা সাধারণ Student Pass-এর আওতায় সরাসরি পরিবার নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান না।

পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রয়োজন হলে Long-Term Visit Pass-এর মতো পৃথক ব্যবস্থার আওতায় আবেদন করতে হতে পারে।

মালয়েশিয়া: মাস্টার্স ও পিএইচডিতে ডিপেন্ডেন্ট সুবিধা

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য জনপ্রিয় মালয়েশিয়ায় মাস্টার্স বা পিএইচডির মতো দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে অধ্যয়নরত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা পরিবারের সদস্যদের জন্য Dependant Pass-এর আবেদন করতে পারেন।

এ প্রক্রিয়া Education Malaysia Global Services (EMGS)-এর মাধ্যমে সম্পন্ন করার সুযোগ রয়েছে।

হংকং: পরিবার নেওয়ার সুযোগ, তবে কাজের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা

হংকংয়ে স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত পূর্ণকালীন ডিগ্রি প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট শর্তে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিতে পারেন।

তবে ডিপেন্ডেন্টরা আলাদা অনুমতি ছাড়া কাজ করতে পারেন না। ফলে পরিবার নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কাজের সুযোগ বিবেচনা করলে বিষয়টি আগে যাচাই করা জরুরি।

চীন: S1 ও S2 ভিসার ব্যবস্থা

চীনে শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের জন্য অবস্থানের মেয়াদ অনুযায়ী S1 অথবা S2 ভিসার ব্যবস্থা রয়েছে।

১৮০ দিনের বেশি সময় অবস্থানের ক্ষেত্রে S1 এবং স্বল্পমেয়াদি অবস্থানের জন্য S2 ভিসার মাধ্যমে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ?

পরিবারসহ বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যেতে চাইলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে চিন্তা করলেই হবে না। একই সঙ্গে ডিপেন্ডেন্ট ভিসার যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা, বাসস্থানের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যবীমা, সম্পর্কের প্রমাণ এবং পরিবারের সদস্যদের কাজের অনুমতি—সবকিছু যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে “পরিবার নিতে পারা” এবং “পরিবারের সদস্য কাজ করতে পারা”—এই দুটি বিষয় এক নয়। কোনো দেশে সঙ্গীকে সঙ্গে নেওয়ার অনুমতি থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে। আবার কোথাও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে কাজের সুযোগ পাওয়া যায়।

শেষ কথা

বিদেশে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পরিবারকে সঙ্গে রাখার বিষয়টি অনেক বিবাহিত শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নিউজিল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে নির্দিষ্ট শর্তে পরিবারের সদস্যদের নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডসসহ কিছু দেশে পরিবারের সদস্যদের ভিসা ও কাজের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তবে ভিসা নীতি নিয়মিত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি অভিবাসন ও ভিসা ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ নিয়ম, যোগ্যতা ও কাজের অনুমতি যাচাই করা জরুরি। মূল প্রতিবেদনের তথ্যের সূত্র হিসেবে Legit.ng ও Vanguard-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

Share This:
You might also like