গুগলের ভুলে তিন বছর বিড়ম্বনায় মাসুদ

বাংলা টাইমস ডেস্ক:

বৃষ্টির দিনে ছাতা মাথায় বের হতে হবে নাকি তাপদাহ বাড়বে—আবহাওয়ার হালনাগাদ তথ্য জানতে গুগলে সার্চ দিয়ে ফোন দেওয়ার অভ্যাস অনেকেরই। তবে সার্চ ইঞ্জিনের এক অদ্ভুত কারিগরি ভুলে টানা আড়াই বছর চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাভারের এক তরুণ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সরকারি নম্বরের জায়গায় ভুলবশত গুগলে যুক্ত ছিল ওই তরুণের ব্যক্তিগত নম্বর। ফলে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও দেশের মানুষকে বিনামূল্যে ‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস’ দিতে গিয়ে ঘাম ছুটেছে সাভারের মাসুদ রানার।

অফিসের ডিউটি না হলেও দিন-রাত অসময়ে ফোন বেজে উঠলেই আঁতকে উঠতেন সাভারের শিমুলিয়া ইউনিয়নের নতুন বন্দর এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা। সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিক থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তারাও ফোন করে জানতে চাইতেন আবহাওয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি। তবে সম্প্রতি গুগল বিষয়টি সংশোধন করে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঠিক সরকারি নম্বরটি যুক্ত করায় দীর্ঘদিনের বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পেয়েছেন তিনি।

নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা মাসুদ রানা আশুলিয়ার হাফিজ উদ্দিনের ছেলে। পূর্বে টঙ্গীর একটি ইলেকট্রিক ফ্যান কোম্পানির শোরুমে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করলেও বর্তমানে তিনি বেকার। বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট বোনকে নিয়ে সংসারে যখন তীব্র টানাপোড়েন, তখন গুগল সার্চের এই ভুল যেন তার জীবনে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছিল। মাসুদের এমন আজব ভোগান্তির কথা শুনে স্থানীয়রা সমবেদনা জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন।

স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, ছেলেটা কোনো চাকরি খুঁজে পাচ্ছে না, অথচ গুগল তাকে দেশের আবহাওয়াবিদ বানিয়ে দিয়েছে! দিন-রাত মানুষ তাকে ফোন দিয়ে অতিষ্ঠ করে তুলত, অথচ বেচারা কিছুই জানে না। এত বড় একটা সরকারি দপ্তরের বিষয়টি নজর দেওয়া উচিত ছিল।

আক্ষেপ ও হতাশা প্রকাশ করে মাসুদ রানা বলেন, ২০০৯ সাল থেকে বাবার নামে নিবন্ধিত এই সিমটি ব্যবহার করছি। ২০২৩ সাল থেকে হঠাৎ গুগলে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বা বাংলাদেশ মেটেরোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট লিখে সার্চ করলে সরাসরি আমার নম্বরটি দেখানো শুরু হয়। ২৪ ঘণ্টা ফোন আসতে থাকে। সাংবাদিকসহ অনেকে ফোন দিয়ে বৃষ্টির খবর, ভূমিকম্পের মাত্রা বা তাপমাত্রা জানতে চাইতেন। গত দুদিন আগে গুগল নম্বরটি সংশোধন করেছে। তবে এত দিনের বিড়ম্বনায় আমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নূরুল করিম বিষয়টিকে গুগলের প্রযুক্তিগত ভুল হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আমাদের নিজস্ব অফিসিয়াল ওয়েবসাইট রয়েছে। গুগল কীভাবে কার নম্বর দেখিয়েছে, তা তাদের নিজস্ব বিষয়। এতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের কোনো হাত নেই। বিষয়টি সম্পর্কে আমি প্রথম জানলাম। গুগলে কী তথ্য প্রদর্শিত হচ্ছে তা আমাদের এভাবে দেখা হয় না। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, গুগলের ওপেন কোলাবোরেটিভ ফিচার ও ওপেন ডেটা সুবিধার কারণে অনেক সময় এ ধরনের তথ্যগত বিভ্রান্তি ঘটে থাকে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইটি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীম কায়সার বলেন, গুগল ম্যাপ একটি কোলাবোরেটিভ পদ্ধতি অনুসরণ করে। যেখানে যে কেউ কোনো লোকেশন পিন করে নাম ও তথ্য সরবরাহ করতে পারে। বাংলায় ‘বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর’ লিখে সার্চ করলে ম্যাপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গুগল তা প্রদর্শন করে। সম্ভবত অতীতে কেউ ভুলবশত মাসুদের নম্বর দিয়ে পিন জেনারেট করেছিল, যা থেকে এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি।

তিনি আরও জানান, গুগলে তথ্য সংযোজন সহজ হওয়ায় ব্যবহারকারীদেরও সচেতন হতে হবে। কোনো ভুল তথ্য চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে ‘রিপোর্ট’ বা ‘ফ্ল্যাগ’ করা উচিত, যাতে গুগল দ্রুত তা সংশোধন করতে পারে।

Share This:
You might also like