নেট রানরেট কী? কিভাবে কাজ করে?
অনলাইন ডেস্ক:
ধরুন, ক্রিকেটের কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে এ, বি, সি, ডি – এই চারটা দল একই গ্রুপে খেলছে। প্রতি ম্যাচের জয়ী দল পাবে দুই পয়েন্ট করে। টাই করলে পাবে এক পয়েন্ট। এখান থেকে দুটো দল উঠবে পরের রাউন্ডে।
যদি তিনটি দল দুটো করে ম্যাচ জিতে, তখন তারা প্রত্যেকেই পাবে ৪টি করে পয়েন্ট। অথবা কোনো দল ৬ পয়েন্ট পেলেও বাকি দলগুলোর প্রত্যেকেই পাবে ২ পয়েন্ট করে। তখন তাহলে কোন দুটো দল যাবে দ্বিতীয় রাউন্ডে? সমস্যা নেই, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায়ও তৈরি করে রেখেছে ক্রিকেটের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাব বা এমসিসি। এমসিসি সমাধান হিসেবে আগে থেকেই চালু রেখেছে নেট রানরেটের হিসেব। চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক নেট রানরেট কী? কিভাবে কাজ করে?
নেট রানরেট কী? কিভাবে হিসেব করা হয়?
নেট রানরেট দিয়ে মূলতঃ কোনো ম্যাচে দুই দলের জয়-পরাজয়ের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কোনো দল যে রানরেটে ব্যাটিং করেছে (অর্জিত রান/ওভার) আর যে রানরেটে বোলিং করেছে (কনসিডেড রান/ওভার), দুটোর ব্যবধানই হচ্ছে নেট রানরেট।
যেমন: পাকিস্তান আগে ব্যাটিং করে ৪০ ওভারে ৩৬০ রান করেছে এবং প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা ৪০ ওভারে করেছে ২৮০ রান। তখন পাকিস্তানের নেট রানরেট হবে +২ (ব্যাটিং রানরেট ৯ – বোলিং রানরেট ৭ = ২)। আর শ্রীলঙ্কার নেট রানরেট হবে -২। বহুজাতিক টুর্নামেন্টগুলোতে দলগুলোর পারফরম্যান্সের বিভাজন করা হয় এভাবে।
ওভারের কোটা পূর্ণ হওয়ার আগে যদি কোনো দল অলআউট হয়?
সেই দলের নেট রানরেট তখন হিসাব করা হবে পুরো ইনিংসের ভিত্তিতেই। যেমন: কদিন আগেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ ১৫ ওভারে ৭৩ রানে অলআউট হয়েছে। সে হিসেবে ব্যাটিং রানরেট ৪.৮৭।
তবে নেট রানরেটের দিক দিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং রানরেট: ৭৩/২০ = ৩.৬৫। কারণ ইনিংসের দৈর্ঘ্য তো ২০ ওভারের। অস্ট্রেলিয়া ৩৮ বলে ৭৮ করে জয় নিশ্চিত করায় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস রানরেট হয়েছে: ৭৮/৩৮*৬=১২.৩২।
সুতরাং বাংলাদেশের নেট রান হয়েছিল: ৩.৬৫-১২.৩২= -৮.৬৭। তাই দ্রুত অলআউট হলে নেট রানরেট বেশি হবে, এমনটা চিন্তা করা যে কোনো দলের জন্য বোকামি।
নেট রানরেট হিসাব-নিকাশে উইকেট কী কোনো প্রভাব ফেলে?
না, এখানে উইকেটের কোনো ব্যাপারই নেই। কোনো দল কত উইকেট হারিয়েছে বা কত উইকেট নিয়েছে, তা কোনো প্রভাব ফেলে না। এটা এই সিস্টেমের বড় একটা সমস্যা। বিশেষ করে, ৫০ ওভারের ওয়ানডেতে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে এই ঝামেলাটা বাধে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ম্যাচের কথা বলা যায়। অকল্যান্ডে টস জিতে আগে ব্যাটিং করা অস্ট্রেলিয়া ৩২.২ ওভারে ১৫১ রানে অলআউট হয়ে যায়।
নিউজিল্যান্ড ৯ উইকেট হারিয়ে ২৩.১ ওভারেই করে ফেলে ১৫২ রান। মাত্র ১ উইকেটের জন্য অলআউট না হয়ে কিউইদের নেট রানরেট গিয়ে দাঁড়ায় +৩.৫৪। কারণ নিউজিল্যান্ডের ইনিংস রানরেট ৬.৫৬ এবং অস্ট্রেলিয়াকে ১৫১ রানে অলআউট বোলিংয়ে ব্ল্যাক ক্যাপসদের রানরেট ৩.০২: (৬.৫৬-৩.০২= +৩.৫৪)।
ডিএলএসে নেট রানরেট কিভাবে কাজ করে?
বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে নেট রানরেটের হিসাব আসল স্কোরের পরিবর্তে ডিএলএস স্কোরের ভিত্তিতে করা হয়। দুটো উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি –
১। টিম ‘এ’ আগে ব্যাটিং করে ২০ ওভারে ১৮০ রান করেছে। পরে বৃষ্টির বাধায় ম্যাচ নামিয়ে আনা হয় ১৫ ওভারে। প্রতিপক্ষ ‘বি’ টিমের জন্য পরিবর্তিত লক্ষ্য ধরা যাক, ১৫ ওভারে ১৫১।
তখন নেট রানরেটের হিসাবে টিম ‘এ’ এর স্কোর ধরা হবে ১৫ ওভারে ১৫০। ইনিংস রানরেট গিয়ে দাঁড়াবে: ১৫০/১৫=১০। তখন ‘বি’ দল যদি ‘এ’ দলের আসল রানরেট (১৮০/২০=৯) এর সমান রেটে ব্যাটিং করে, তাহলে ‘বি’ দল হারবে, কারণ পরিবর্তিত রিকোয়ার্ড রেট ৯ এর চেয়েও বেশি।
২। টিম ‘এ’ আগে ব্যাটিং করে ২০ ওভারে ১৮০ রান করেছে। টিম ‘বি’ ১০ ওভার ব্যাটিং করে ২ উইকেটে ৮৭ রান করার পর খেলা বন্ধ হয়ে গেল। ধরে নেওয়া যাক, ২ উইকেটের হিসাবে ১০ ওভারে পার স্কোর ৮২। ডিএলএস মেথডে ‘বি’ দল জিতবে ৫ রানে। টিম ‘বি’ এর নেট রানরেট হবে ০.৫ [(৮৭/১০) – (৮২/১০)=৮.৭-৮.২=০.৫)।
নেট রানরেট বাড়িয়ে নিতে ব্যাটিং ফার্স্ট না ব্যাটিং সেকেন্ড: কোনটা বেশি প্রয়োজনীয়?
এর কোনো চিরন্তন নিয়ম নেই যে আগে না পরে ব্যাটিং করতে হবে। তবে আগে ব্যাটিং করে যতটা সম্ভব রানরেট বাড়িয়ে রাখতে হবে আর যত দ্রুত সম্ভব রান তাড়া করতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে ৫ নভেম্বর দুবাইয়ে ভারত-স্কটল্যান্ড ম্যাচের কথা বলা যায়। ম্যাচের আগে ভারতের নেট রানরেট ছিল +০.০৭৩ কিন্তু ম্যাচ শেষে নেট রানরেট গিয়ে দাঁড়ায় +১.৬১৯।
টস জিতে স্কটল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে ৮৫ রানে অলআউট করে দিয়েছিল ভারত। পরে ৮৬ রানের লক্ষ্য ভারত পেরিয়ে যায় ৬.৩ ওভারে। ভারত যদি আগে ব্যাটিং করে পুরো ২০ ওভারে ২০৩ রান করে স্কটল্যান্ডকে ৮৫ রানে গুটিয়ে দিত, তাহলেও এই সমপরিমাণ নেট রানরেট পেত।
আবার লম্বা সময় ধরে চলমান কোনো লিগের ক্ষেত্রে, নেট রানরেট বাড়াতে আগে ব্যাটিং করে যতটা সম্ভব বেশি রান করতে হবে।
২০২১ আইপিএলের একটা উদাহরণ দিই। মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের প্লে অফ খেলতে হলে শেষ ম্যাচে প্রয়োজনীয় নেট রানরেট বাড়াতে আগে ব্যাট করে প্রতিপক্ষকে ১৭০ রানে হারানোর দরকার ছিল।
সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের বিপক্ষে টস জিতে আগে ব্যাটিং করে ২০ ওভারে ৯ উইকেটে ২৩৫ করেছিল মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স। সানরাইজার্সকে যে করেই হোক, ৬৫ রানে আটকে ফেললেই মুম্বাই প্লে-অফে। তবে সানরাইজার্স যখন ৬৬ রান করে, মুম্বাই প্লে-অফের রেস থেকে ছিটকে যায়।








