১ লাখ ডলারে বিয়ে, গ্রীনকার্ড হলেই ডিভোর্স
Bangla Times Desk:
প্রেমের দরকার নেই। বর-কনের আগে পরিচয়ও থাকতে হবে না। এক লাখ ডলার দিলেই মিলবে বিয়ে—সঙ্গে থাকবে বিয়ের ছবি, যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, একসঙ্গে ট্যাক্স রিটার্ন। এমনকি ইমিগ্রেশন অফিসার কী প্রশ্ন করতে পারেন, তার উত্তরও মুখস্থ করানো হবে। আর গ্রিন কার্ডের কাজ শেষ? এবার ডিভোর্স।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, নিউ ইয়র্ককে কেন্দ্র করে প্রায় এক দশক ধরে এভাবেই চলছিল বিশাল এক ভুয়া বিয়ের কারবার।
১২ আগস্ট নিউ ইয়র্কের ফেডারেল আদালতে প্রকাশ করা অভিযোগপত্রে ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৬ খৃস্টাব্দের জুলাই পর্যন্ত এই নেটওয়ার্ক এক হাজারের বেশি ভুয়া বিয়ের ব্যবস্থা করেছে। গ্রিন কার্ড পেতে চাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই ছিলেন চীনা নাগরিক। পুরো ব্যবস্থাটিই ছিল অনেকটা ব্যবসায়িক প্যাকেজের মতো।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, একজন বিদেশি নাগরিককে ভুয়া বিয়ে এবং গ্রিন কার্ডের ব্যবস্থা করে দিতে নেওয়া হতো সর্বোচ্চ এক লাখ ডলার। এরপর খোঁজা হতো বিয়েতে রাজি একজন মার্কিন নাগরিককে। তাকে দেওয়া হতো সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ডলার। আর একজন মার্কিন নাগরিক জোগাড় করে দেওয়ার বিনিময়ে রিক্রুটার পেতেন সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ডলার কমিশন।
তবে সেই ৩০ হাজার ডলারও একবারে দেওয়া হতো না।অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ে করে গ্রিন কার্ডের আবেদন জমা দেওয়ার পর দেওয়া হতো প্রথম কিস্তি। দুই বছরের কন্ডিশনাল গ্রিন কার্ড পাওয়ার পর সাধারণত দেওয়া হতো ১৫ হাজার ডলারের দ্বিতীয় কিস্তি। আর স্থায়ী গ্রিন কার্ড হয়ে গেলে সাধারণত আরও পাঁচ হাজার ডলার দেওয়া হতো।
কিন্তু বিয়েটাকে USCIS-এর কাছে সত্যিকারের দাম্পত্য সম্পর্ক হিসেবে দেখাতে হতো। সেখানেই শুরু হতো অভিনয়ের দ্বিতীয় পর্ব।
ফেডারেল অভিযোগপত্র অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে বর-কনের প্রথম দেখাই হতো নিউ ইয়র্ক সিটির Clerk’s Office-এর আশপাশে- যেদিন তারা ম্যারেজ লাইসেন্স নিতে যেতেন। সেদিনই কখনো বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো। কাছের রেস্তোরাঁয় চীনা ঐতিহ্যবাহী বিয়ের পোশাক পরে ছবি তোলা, সঙ্গে বন্ধু-স্বজন- সবকিছু এমনভাবে সাজানো হতো, যেন এটি সত্যিকারের বিয়ে।
এরপর তৈরি করা হতো দাম্পত্য জীবনের নানা প্রমাণ।একসঙ্গে ছবি, যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ইউটিলিটি ও মোবাইল ফোন অ্যাকাউন্ট, যৌথ ট্যাক্স রিটার্ন- এমনকি জীবনবীমায় একজনকে আরেকজনের beneficiary বানানোর অভিযোগও রয়েছে। এসব নথি পরে USCIS-এর কাছে বিয়ের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া হতো বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।
আর ইমিগ্রেশন ইন্টারভিউ? সেটারও থাকত রিহার্সাল।
USCIS কী ধরনের প্রশ্ন করতে পারে এবং কোন প্রশ্নের কী উত্তর দিতে হবে- অভিযোগ অনুযায়ী, ভুয়া দম্পতিদের তা শেখানোর জন্য training session- এরও আয়োজন করা হতো।
এই নেটওয়ার্কের একটি operational hub ছিল ব্রুকলিনের সানসেট পার্কের একটি driving school-এর ভেতরের অফিস। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সেখান থেকে বিয়ের অনুষ্ঠান সমন্বয়, USCIS-এর কাগজপত্র প্রস্তুত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজ করা হতো।
তবে এই ব্যবসা শুধু নিউ ইয়র্কে সীমাবদ্ধ ছিল না। কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, পেনসেলভেনিয়া, কেনটাকি, টেন্নেসি, জর্জিয়া ও ফ্লোরিডা থেকে শুরু করে চায়না ও ভানুয়াতু পর্যন্ত এর বিস্তার ছিল বলে ফেডারেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। শুধু কানেকটিকাটে-এই প্রায় ১০০টি ভুয়া বিয়ের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
আরও বিস্ময়কর অভিযোগ—কেনটাকির একটি মার্কিন সেনাঘাঁটিতে কর্মরত অন্তত ১৪ জন active-duty Army member-কে এই ধরনের বিয়ের জন্য রিক্রুট করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে অন্তত ১১ জনের বিয়ে হয়েছিল চীনা নাগরিকের সঙ্গে বলে অভিযোগপত্রে-এ উল্লেখ রয়েছে।
সবচেয়ে সরাসরি চিত্রটি পাওয়া যায় অভিযুক্তদের একটি কথোপকথনে।
এক মার্কিন নারী তার কথিত স্বামীর কাছে খাবার কেনার টাকা চাইছিলেন। অভিযোগপত্রে উদ্ধৃত একটি বার্তায় তখন তাকে মনে করিয়ে দিতে বলা হয়—এটি একটি “business transaction”; লোকটি তার সত্যিকারের স্বামী নয়। তাই তার জীবনযাত্রার খরচ বহনের কোনো দায়িত্বও তার নেই।
আর গ্রিন কার্ড হয়ে গেলে?
ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, স্থায়ী গ্রিন কার্ড পাওয়ার পর—অথবা আবেদন ব্যর্থ হলে- এই একই নেটওয়ার্ক ভুয়া দম্পতিদের ডিভোর্সের ব্যবস্থাতেও সহায়তা করত।
এই মামলায় ব্রুকলিন, কুইন্স, স্ট্যাটেন আইল্যান্ড, পিকস্কিল ও অসিনিংয়ের মোট ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে marriage fraud ও immigration fraud conspiracy-সহ দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। একটি অভিযোগে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং অন্যটিতে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলো এখনো ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ। আদালতে ১১ আসামির কেউই এখনো এই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হননি।
প্রেম নেই, সংসার নেই- কিন্তু বিয়ে আছে। বিয়ের অ্যালবাম আছে, যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে, ট্যাক্স রিটার্ন আছে। এমনকি ইমিগ্রেশন ইন্টারভিউয়ের জন্য দাম্পত্য জীবনের গল্পও প্রস্তুত।
ফেডারেল সরকারের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে, নিউ ইয়র্কের এই বিয়ের ব্যবসায় শুধু একটি জিনিসই আসল ছিল- গ্রিন কার্ড।
#nyclife #greencard #marriage #scam #usareels







