মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থান: নিয়মতান্ত্রিক অবস্থান, সমৃদ্ধ জীবন
বানা টাইমস ডেস্ক:
মি: জসিম (ছদ্ম নাম) মালয়েশিয়ার কারখানায় কাজ করেন ২০১৬ সাল থেকে। প্রথম মূল বেতন ছিলো ১৫০০ রিঙ্গিত। সে দেখতে ছিল হালকা পাতলা, নিজেও সংশয়ে ছিল যে এসব কাজ করতে পারবে কি না! কারণ বাংলাদেশে এ ধরনের কাজের দেখার কোনো সুযোগ নেই, কলকারখানা নেই। অজানা, অনভিজ্ঞতা ও অদক্ষতাকে সাথী করে মালয়েশিয়ায় পেনাং এ খ কারখানায় কাজ যোগ দেয়।
প্রথমে কোম্পানিতে সে ৮ ঘণ্টা কাজ এরপর ২/৩ ঘণ্টা ওভার টাইম করে। কাজের প্রেসার সহ্য করা কঠিন ছিল। মি: জসিম বলেন এত কাজ জীবনেও করিনি। ভাবতাম এইরকম কাজ যদি দেশে করতাম তাহলে দেশেই আমি স্বাবলম্বী হতাম। আসলে কাজের কোনো বিকল্প নাই, সৎ হতে হবে। আমি যদি এই কারখানা থেকে পালিয়ে অন্য কোথাও যেতাম তাহলে কি আজ যে আমি লাইন ম্যানেজার হয়েছি, বেতন মাসে ৩৫০০/৪০০০ রিঙ্গিত মাসে মাসে পাচ্ছি সেটা কি পেতাম? কারণ এখান থেকে লোভে পরে কয়েকজন পালিয়ে অন্য কোথাও গিয়েছে কিন্তু আমার থেকে ভালো নেই। ওরা দৌড়ের উপরে আছে। তাদের মধ্যে একজন এরেস্ট হয় জেল খেটে এখন দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। আর বাকি দুজন কোথায় আছে জানি না।
সাধারণত ভালো কাজ, বেশি বেতন, ভালো আবাসন সুবিধা ইত্যাদির কথা এক ধরনের লোক আছে ওরা ভাগিয়ে নিয়ে যায়। তারপর সেই পলাতক কর্মীর নামে পুলিশ রিপোর্ট ও ইমিগ্রেশনে রিপোর্ট করে কোম্পানি, এর সাথে কোম্পানির জিনিস চুরি করা ইত্যাদি যোগ হলে অনেক কঠিন আইনি জটিলতা তৈরি হয়। তাদেরকে গ্রেফতার হতে হয়, ৩/৫ মাস জেল, আর্থিক জরিমানা এবং ২/৩ টি বেত্রাঘাত শাস্তি পেতে হয়। বেত্রাঘাত শাস্তি খুবই কঠিন এই শাস্তি জীবনী শক্তি কমিয়ে দেয়। তাছাড়া জেলখানার পর ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয় দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য। একসময় ফ্লাইট টিকিট পেলে নিজ দেশে ফেরত পাঠায়। এভাবে বৈধ কোম্পানি থেকে পালিয়ে যাওয়া, কিছু দিন এখানে সেখানে লুকিয়ে থেকে কাজ করা, একসময় গ্রেফতার, জেল, এবং ডিটেনশন সেন্টারে অপেক্ষা সব মিলিয়ে জীবন দেখে ১/২ বছর চলে যায় এবং তখন জীবন প্রকৃত নরকে পরিণত হয়।
মিস্টার জসিম বলেন, লোভ করতে গিয়ে বিপদে পড়ে। এমন লোভের দরকার নেই। এতে যে লোভে পরে তার কোনো লাভ হয় না বরং যারা পালিয়ে যাওয়ার লোভ দেখায় তারাই লাভবান হয়। মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশনের বিভিন্ন সময়ের সংবাদ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বৈধ নিয়োগকর্তা বা কোম্পানি থেকে যারা পালিয়ে যায় তারা আরেকটি চক্রের মধ্যে পরে, এই চক্র পরবর্তীতে তাদের বন্দী করে রাখে, তাদের চলাফেরা, খাওয়া সব কিছু কন্ট্রোল করে, এদের পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে ডকুমেন্ট বিহীন করে, ফলে প্রথমে চেক করলে এরা কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে পারে না এবং নদী পথে না আকাশ পথে অবৈধভাবে না বৈধভাবে এসেছে কোনো কিছুই নির্ণয় করা যায় না। তখন তাদের এরেস্ট করে তদন্তে নেওয়া হয়।
তদন্তে অনেকে দুঃখের কথা বলে কিন্তু করার কিছুই থাকে না, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। যারা এরেস্ট হয় না তাদের ১/২ জনকে নকল কাগজ ভিসা ধরিয়ে দেয়, এটিও একসময় ধরা পরে। মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন সময় নকল পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরি করে এমন গ্যাংদের গ্রেফতার করেছে। সম্প্রতি মানব পাচারের ইকবাল গ্যাং কে মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন ধরেছে। গ্লোবাল লেবার অর্গানাইজেশনের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান, ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, যে কাউকে প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধ করা এটি মানব পাচারের অপরাধ, শ্রম শোষণের অপরাধ। মালয়েশিয়া পুলিশ ও ইমিগ্রেশনের তথ্য অনুযায়ী এ ধরনের মালয়েশিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকরা অপরাধমূলক কাজগুলো করে সাধারণত দেশী বিদেশি ব্যক্তিরা মিলে।
ইমিগ্রেশনের তথ্য মতে সব থেকে বেশি শিকার হয়েছেন বাংলাদেশের কর্মীরা এবং এদের প্রত্যেকের পিছনে মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশীরা আছে। তাদের কারণে শিক্ষক, এক্সপাট, শিক্ষার্থী এবং বৈধভাবে কাজ করা লক্ষ লক্ষ ভালো মানুষগুলো সমস্যার শিকার হচ্ছে, তাদের চেক এর মুখে পড়তে হয়, হয়রানি হয় ইত্যাদি। তানাগানিতা মালয়েশিয়ায় অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সব থেকে পুরোনো এনজিও যাদের নিকট হাজারো দুঃখের কাহিনী জমা আছে।
তেমনি নর্থ সাউথ ইনিশিয়েটিভ যারা অভিবাসী কর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে, তাদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে, বাংলাদেশী কর্মীদের বিপদে পরার অর্থাৎ শ্রম শোষণের এবং মানব পাচারের একটি পদ্ধতি ছিল আউট সোর্সিং যেটাকে বাংলাদেশে ফ্রি ভিসা বলে থাকে। এই ফ্রি ভিসায় একসময় বাংলাদেশ থেকে কর্মী এনে নিজেদের দখলে একধরনের বন্দী করে রাখত, কাজ ও আবাসন দেবার জন্য টাকা নিতো, বেতনের একটি অংশ কেটে নিত এমনকি বাংলাদেশির বাড়ি থেকেও টাকা আনতে বাধ্য করত।
এসব একসময় খুব বাজে অবস্থায় গেলে মালয়েশিয়া সরকার বাধ্য হয় শুধু বাংলাদেশীদের জন্য সেই ফ্রি ভিসা বা আউট সোর্সিং নিষিদ্ধ করে। নর্থ সাউথ ইনিশিয়েটিভ এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও কো ফাউন্ডার আদ্রিয়ান পেরেইরা বলেন, আমরা দেখেছি যে আউট সোর্সিং বন্ধ হলেও বাংলাদেশ থেকে কর্মী এনে আসল নিয়োগকর্তার অধীনে না দিয়ে কৌশলে নিজেদের দখলে বা বন্দিত্বে রাখে। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী এটি গুরুতর অপরাধ, কর্মী অবৈধ হয় এবং সে সব সময় রিস্কের উপর থাকে




