নির্বাচনে বিস্ময়কর উত্থান ঘটলেও হাইপ অনুযায়ী কেন ফল পায়নি জামায়াত

দি ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দি ডিপ্লোম্যাট’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে অভূতপূর্ব প্রচারণা, নারী ও সংখ্যালঘুদের সম্পৃক্তকরণ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জোটে টেনে ব্যাপক ‘হাইপ’ বা উন্মাদনা তৈরি করলেও ভোটের চূড়ান্ত ফলাফলে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি দলটি।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মাঠপর্যায়ে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধি এবং ভোট শতাংশ বাড়লেও কেন তারা একক আধিপত্যের বদলে বিএনপির পেছনে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে বিরোধী দলের আসনেই থমকে গেল। সুফি ঐতিহ্যের ভোটারদের সাথে দূরত্ব এবং ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাগুলোই এই ‘প্রাপ্তিতে ভাটার’ প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

দি ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ তার ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় নির্বাচনী পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ছায়ায় অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেছে—যে বিপ্লব শেখ হাসিনাকে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছিল।

 

বিএনপির এই বিজয় ছিল সুনিশ্চিত, কিন্তু বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর উত্থান ছিল সমানভাবে বিস্ময়কর এবং সম্ভবত বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদী গতিপথের জন্য আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে জামায়াত ছিল একটি প্রান্তিক শক্তি, যা মূলত তার স্বাধীনতা-বিরোধী উত্তরাধিকার এবং আদর্শিক কঠোরতার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছিল। তবুও এই নির্বাচনে দলটি সরাসরি ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে এবং জোটগতভাবে ৭৭টি আসন পেয়ে আইনসভার প্রায় এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসন পেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এই সংখ্যাগুলো জামায়াতের অভাবনীয় সাফল্য এবং একই সঙ্গে এর সীমাবদ্ধতা উভয়ই প্রকাশ করে।

 

জুলাই বিপ্লবের পর নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও জামায়াত তার রাজনৈতিক গতিকে পূর্ণ আধিপত্যে রূপান্তর করতে পারেনি। মধ্যপন্থী আবেদন নিয়ে বিএনপিই অধিকাংশ মানুষের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে ছিল।

 

বিস্ময়ের জায়গাটি হলো জামায়াতের এই পরিবর্তনের বিশালতা। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটি কখনোই জাতীয় ভোট ব্যাংকের ১২ শতাংশ অতিক্রম করতে পারেনি। কিন্তু এবার তারা প্রায় ৩২ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এই উল্লম্ফন আকস্মিক ছিল না। জামায়াত ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে, ১১-দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়েছে, পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছে এবং নজিরবিহীনভাবে নারী ও সংখ্যালঘুদের সম্পৃক্ত করেছে। এমনকি ১৯৭১ সালের কলঙ্ক ঘুচাতে তারা অলি আহমদ এবং মেজর আখতারুজ্জামানের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরও নিজেদের সাথে যুক্ত করেছে।

 

জুলাই বিপ্লব যে দুয়ার খুলে দিয়েছিল, জামায়াত তাতে আত্মবিশ্বাসের সাথে পা রেখেছে। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, ‘‘বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা ও বাধানিষেধের পর সংসদে জামায়াতের এই প্রত্যাবর্তন হলো রাজনৈতিক অপ্রাসঙ্গিকতার প্রান্ত থেকে ফিরে আসা।’’ তবে এই প্রত্যাবর্তন ছিল অসম্পূর্ণ। প্রচারণার যে জোয়ার ছিল, প্রাপ্তি তার সাথে পুরোপুরি মেলেনি।

 

এর কারণগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। জামায়াতের আদর্শিক ইসলামপন্থা সবসময়ই দেশের সুফি ঐতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। লক্ষ লক্ষ মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনে মাজার এবং পীর-মাশায়েখরা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন এবং জামায়াতের কট্টরপন্থী অবস্থান এই গোষ্ঠীকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। উদারপন্থী ভোটাররা জামায়াতের কঠোরতা নিয়ে সন্দিহান থাকায় তারা নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিএনপিকেই বেছে নিয়েছেন। এছাড়া মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ৯৭টি সুফি মাজারে হামলার স্মৃতিও ভোটারদের মনে ভীতি জাগিয়েছিল, যা জামায়াতকে একটি অস্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখার ধারণাকে শক্তিশালী করেছে

ইতিহাসের বোঝাও ছিল অনেক ভারী। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের বিরোধিতা, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান এবং স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি হিসেবে দীর্ঘ ইতিহাস এমন এক ক্ষত তৈরি করেছে যা কোনো জোট রাতারাতি মুছে ফেলতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টাটি চতুর হলেও তা যথেষ্ট ছিল না। যারা এখনও জামায়াতকে বিশ্বাসঘাতকতার চশমায় দেখেন, তাদের কাছে বিএনপির মধ্যপন্থী অবস্থানই বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।

 

তবুও, এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জামায়াতের সরব উপস্থিতি এখন অনস্বীকার্য। প্রথমবারের মতো দলটি সংসদে বিরোধী দল হিসেবে বসেছে, যার হাতে রয়েছে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার এবং নীতি নির্ধারণী বিতর্কে ভূমিকা রাখার ম্যান্ডেট। এটি কোনো ছোট সাফল্য নয়। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা কেবল সান্ত্বনা পুরস্কার নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। জামায়াত এখন প্রমাণ করার সুযোগ পেয়েছে যে তারা কেবল একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি নয়। তারা নিজেদের একটি প্রগতিশীল, জনমুখী দল হিসেবে গড়ে তুলতে পারে যারা বাংলাদেশের বর্তমান সংকটগুলো—যেমন অর্থনৈতিক স্থবিরতা, বিচারিক বিতর্ক, দুর্নীতি এবং কর্মসংস্থানের অভাব—নিয়ে কাজ করবে। অথবা তারা পুনরায় আদর্শিক কঠোরতায় ফিরে গিয়ে নিজেদের অর্জনগুলো হারিয়ে ফেলতে পারে।

 

ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে হলে সমঝোতা প্রয়োজন। জামায়াতকে অবশ্যই তাদের কট্টরপন্থা কমিয়ে উদারপন্থী এবং সুফি ঘরানার মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার পথ খুঁজে বের করতে হবে, তবে তা নিজেদের পরিচয় বিলীন না করে। নারী ও সংখ্যালঘুদের কাছে পৌঁছানোর এই চেষ্টা কেবল কৌশলগত চাল নয়, বরং একটি প্রকৃত প্রতিশ্রুতি হিসেবে চালিয়ে যেতে হবে। তাদের শিখতে হবে চতুর রাজনীতি এবং আপোসের শিল্প। তবেই তারা বর্তমান কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজেদের ভিত্তি প্রসারিত করতে পারবে এবং বিএনপির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে।

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তিত হচ্ছে এবং জামায়াতের উত্থান এর একটি লক্ষণ ও কারণ উভয়ই। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, জামায়াত তা আংশিকভাবে পূরণ করতে সক্ষম হওয়া একটি নতুন যুগের ইঙ্গিত দেয়। যে দলটি একসময় বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল, তারাই এখন এর বিরোধী দল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই পরিহাস গভীর হলেও সুযোগটি বিশাল। সংখ্যা হয়তো জামায়াতের পক্ষে সবটুকু নেই, কিন্তু রাজনৈতিক বয়ান বদলে গেছে। প্রান্তিক পর্যায় থেকে কেন্দ্রে পৌঁছে জামায়াত একটি নতুন সীমা অতিক্রম করেছে।

 

এখন প্রশ্ন হলো তারা সেখানে টিকে থাকতে পারবে কি না। জামায়াত যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি গ্রহণ করে, প্রজ্ঞার সাথে জাতীয় সংকটগুলো মোকাবিলা করে এবং বাংলাদেশের সমাজের বৃহত্তর অংশের সাথে কথা বলতে শেখে, তবে তারা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। আর যদি তারা কেবলই তাদের আদর্শিক গোঁড়ামিতে আটকে থাকে, তবে তারা আবারও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

পথটি কঠিন এবং চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। বাংলাদেশের গণতন্ত্র—যা ভঙ্গুর কিন্তু স্থিতিস্থাপক—এমন একটি বিরোধী দলের ওপর নির্ভর করে যারা দায়িত্বশীলতার সাথে ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে। জামায়াত সেই সুযোগটি পেয়েছে। তারা এটি কতটা কাজে লাগাতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করবে কেবল তাদের নিজেদের ভাগ্য নয়, বরং পুরো জাতির গতিপথ।

Share This:
You might also like