দেশি বানাতে সাদা চিনিতে কাপড়ের রং

অনলাইন ডেস্ক:

সাদা চিনিতে টেক্সটাইল মিলে কাপড়ে ব্যবহৃত রং মিশিয়ে ‘আখের তৈরি দেশি চিনি’ বলে বিক্রি করা হচ্ছে দোকানে দোকানে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ৯০ টাকা দরের সাদা চিনিতে রং মিশিয়ে প্যাকেটজাত করে ‘দেশি চিনি’ লিখে বিক্রি করছে ১১০-১২০ টাকা দরে। আর বাজারে চলমান চিনির কৃত্রিম সংকট পুঁজি করে এসব চিনি এক কেজির প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা পর্যন্ত।

চিকিৎসকরা বলছেন, ক্ষতিকর রং ও রাসায়নিক মেশানো এসব চিনি শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক। এই চিনি খেলে তা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আক্রান্ত হতে পারে কিডনি রোগে। আর ক্যান্সারের ঝুঁকিও রয়েছে।

সম্প্রতি ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে একাধিক প্রতিষ্ঠানে ‘ক্ষতিকর’ লাল চিনি পাওয়া যায়। জব্দ করা হয় চিনিতে মেশানো রংও। অভিযানকারী কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাস্থ্য সচেতন ক্রেতারা সব সময় চেষ্টা করেন ভেজালমুক্ত খাঁটি খাদ্য পণ্য কেনার। চিনির ক্ষেত্রে ক্রেতারা তাই পরিশোধিত ক্ষতিকর চিনির পরিবর্তে বেছে নেন চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের উৎপাদিত আখের হালকা বাদামি রঙের দেশি চিনি। কিন্তু ব্যাপক চাহিদার তুলনায় এই চিনির জোগান কম। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা চিনি কর্পোরেশনের উৎপাদিত আখের চিনির মোড়ক হুবহু নকল করে কৃত্রিম রঙ ও কেমিক্যাল মিশিয়ে নিম্নমানের চিনি বাজারজাত করেছে। দোকানি বেশি লাভের আশায় এ ধরনের ভেজাল চিনি বিক্রি করছেন।

গতকাল রাজধানীর কারওয়ানবাজার, রামপুরা, মগবাজার ও পুরান ঢাকার কয়েকটি এলাকার বাজার ঘুরে দেখা যায়, ক্ষতিকর রং ও কেমিক্যাল মেশানো চিনিতে বাজার সয়লাভ। ‘সজীব’, ‘সতেজ’, ‘গাংচিল’, ‘কেয়া’, ও ‘খাটি’সহ হরেক নামে এই লাল চিনি বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেগুলো হুবহু চিনি করপোরেশনের দেশি চিনির প্যাকেটের মতো। তবে প্যাকেটের এক কোনে ছোট করে লেখা থাকে এসব নাম। তবে প্যাকেটের গায়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো ঠিকানা নেই। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ভ্রাম্যমাণ সরবরাহকারীরা এসব চিনি তাদের দিয়ে যান। বিভিন্ন কোম্পানির নাম দিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে বাজারজাত করা হচ্ছে এসব ভেজাল ক্ষতিকর চিনি।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ. এইচ. এম সফিকুজ্জামান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ইতোমধ্যেই কয়েকটি অভিযানে ভেজাল-নকল লাল চিনি ধরা পড়েছে। চিনিগুলো ধ্বংস এবং বিক্রেতাদের জরিমানা করা হয়েছে। এসব চক্রের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং অভিযান চলমান রয়েছে।

গত ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অভিযান চালায় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এসময় মেসার্স বেলায়েত স্টোরে ধরে পড়ে লালচে, বাদামি ভেজাল চিনি। সেখানে অভিযান চালিয়ে ২০০ কেজি চিনি জব্দ করা হয়। এসব চিনি আসল না নকল যাচাই করতে বেলায়েত স্টোরের ভেতরেই চিনিতে পানি ঢেলে দেয় অভিযানকারীরা। তখনই বের হয় চিনির রহস্য। চিনি থেকে রং আলাদা হয়ে যায়। পানিতে ধুয়ে সাদা হয়ে যায় চিনি। এসব চিনি কোথা থেকে আনা হয়েছে এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটির মালিক। বিক্রেতার কাছে কোনো ক্যাশ মেমোও পাওয়া যায়নি। ক্ষতিকর এসব চিনির প্যাকেট জনসাধারণের সামনে ধ্বংস করা হয় এবং প্রতারণার অপরাধে বেলায়েত স্টোরকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এর তিন দিন পর ২৫ সেপ্টেম্বর কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় এ আর এন্টারপ্রাইজেও ৩৯ বস্তা ক্ষতিকর ভেজাল লাল চিনি পাওয়া যায়। এই প্রতিষ্ঠানকে সাত দিন জনস্বার্থে দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং ভোক্তা অধিদপ্তরের কার্যালয়ে তলব করা হয়।

অভিযানে থাকা ভোক্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার মণ্ডল ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এসব চিনি যারা প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রি করছে তাদের নির্ধারিত কোনো ঠিকানা প্যাকেটের মোড়কে নেই। প্যাকেটে শুধু ঢাকা, বাংলাদেশ লেখা রয়েছে। এসব অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

এছাড়া গত ১০-১৫ অক্টোবর রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও মৌলভীবাজারে অভিযান চালিয়ে ৮০০ কেজি ভেজাল লাল চিনি জব্দ করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। পরে সেগুলো ধ্বংস করা হয়।

এ ধরনের ভেজাল চিনি কিনে ঠকেছেন উত্তরা ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, তার বাসা রাজধানীর উত্তর ধানমন্ডির কলাবাগানে। তিনি গত শনিবার বিকালে প্যাকেটজাত লাল চিনি কিনে বাসায় যান। চিনি একটি পেয়ালায় ঢালার সময় কৌতুহলবশত আসল নকল পরীক্ষার জন্য সামান্য চিনি নিয়ে পানি ঢেলে দেন। এরপরই দেখেন তিনি ঠকেছেন। চিনিতে রং মেশানো। একপর্যায়ে চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের চিনিকলে উৎপাদিত চিনির প্যাকেটের সাথে মিলিয়ে দেখেন তার সদ্য কেনা দেশি চিনির প্যাকেটের এককোণে ‘সজীব’ লেখা রয়েছে। তখন তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত হন নকল চিনি কেনার বিষয়ে।

বাজারের রংমিশ্রিত ভেজাল চিনির ক্ষতিকর দিক বিষয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘এসব চিনি খেলে মানব শরীরে নানা জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। এ ভেজাল চিনি বিশেষ করে শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এমনকি এসব চিনি খাদ্যে মিশিয়ে ব্যবহার করা হলে প্রথমেই কিডনি আক্রান্ত হবে, এরপর উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে হৃদরোগের ঝুঁকি এবং পরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে’।

Share This:
You might also like