জামায়াতের কব্জায় পোস্টাল ব্যালট
বাংলা টাইমস ডেস্ক:
ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে’- বারবার এমন আশ্বাসবাণী শুনিয়ে আসছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বাকি মাত্র চার সপ্তাহেরও কম সময়। দেশের ১৩ কোটি ভোটার অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশায় মুখিয়ে আছেন। দল-মত ভোটের জোট কিংবা স্বতন্ত্র পরিচয়ের সব প্রার্থী ও তাদের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
কিন্তু এরইমধ্যে পিলে চমকানো খবরাখবর বেরিয়ে গেছে এবং যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরালও হয়েছে যে, প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট পেপার সংগ্রহ করে ‘ঝুট কাগজের স্তূপে’ পরিণত করা হয়েছে। রীতিমতো কাড়াকাড়ি, হুড়োহুড়ি, বাগবিতন্ডা আর ভাগাভাগাগির যেন মচ্ছব বসে গেছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিও এবং কথোপকথন থেকেই তা স্পষ্ট।
তাতে কারোরই আর বুঝতে অসুবিধা হয়না জামায়াতের নেতা-কর্মীদের কব্জায় চলে গেছে শয়ে শয়ে এমনকি হাজারো পোস্টাল ব্যালট পেপার। পরিকল্পিতভাবেই তারা হাতিয়ে নিয়েছে। এ যেন ভোটের আগেই ভোটের মহড়া! এ নিয়ে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত বন্দরনগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে রাজনীতি সচেতন সর্বস্তরের জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ভোটার তথা জনগণের প্রশ্ন, কৌতূহল ও সন্দেহের তীর বর্তমান অন্তবর্তী সরকার এবং করিৎকর্মা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দিকেই।
দীর্ঘদিন যাবত অন্তবর্তী সরকারের দিকে সচেতন নাগরিক মহলের আঙুল এবং বহুল আলোচিত-সমালোচিত বিষয়টি হচ্ছে, সরকারি আমলাতন্ত্র বা প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পরিকল্পিত জামায়াতীকরণ। এবার পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহ করে জামায়াতের কব্জায় নেওয়া থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রশাসনও প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কব্জায় নিয়েছে জামায়াত। তার মানে দাঁড়ায় জামায়াতের ভূতের লম্বা হাত! নাগরিক মহলের মাঝে ঘুরেফিরে আলোচনায় উঠে আসছে, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পোস্টাল ব্যালট জামায়াতের হাতে কব্জায় যাওয়ার পর আরো কি কি তেলেসমাতি দেখার বাকি আছে?
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কী ঘটছে এবং আরো কী হতে যাচ্ছে- এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রবীণ সমাজবিজ্ঞানী একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট ও লেখক প্রফেসর ড. মইনুুল ইসলাম ১৬ জানুয়ারি (শুক্রবার) দৈনিক ইনকিলাবকে বলেছেন, ‘ঘটনাবলী দৃষ্টে সহজেই যেটা বোঝা যাচ্ছে, প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটে ভোটের সিস্টেমটা জামায়াতের নিয়ন্ত্রণেই চলে গেছে। তারাই এখন পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহ করে নিয়ে ভোটিং ম্যানিপুলেট (অসদুপায় অবলম্বন) করবে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাটা ঠিকমতো হ্যান্ডেল করতে পেরেছে কিংবা তা পারবে বলে মনে হয়না। সাধারণ ভোটারদের আস্থার ক্ষেত্রে একটা সন্দেহ-সংশয় তৈরি হয়েছে। ইসি’র উচিত হবে এখনই বিকল্প কার্যকর চিন্তাভাবনা করা। পোস্টাল ব্যালট সিস্টেম আমাদের দেশের বাস্তবতায় কতটুকু কার্যকর এবং ভোটে অসদুপায় থেকে মুক্ত থাকাটা তাতে আদৌ নিশ্চিত হবে কিনা- তাও গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে”।
এদিকে চট্টগ্রামজুড়ে ঘরে-বাইরে পোস্টাল ব্যালট বিশেষ দলের কব্জায় নেয়ার বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে, বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের ব্যাপক সংখ্যক লোক প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী। তথ্য-উপাত্তে জানা যায়, স্বয়ং দেশের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নিজ গ্রাম হাটহাজারীর শিকারপুর নজুমিয়া হাটের লোকজন সবচেয়ে বেশি মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী। যা প্রধান উপদেষ্টা নিজেই অবগত আছেন। তদুপরি প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট পেপার জাময়াত নেতা-কর্মীরা সংগ্রহ করা এবং তা নিয়ে বাকবিতন্ডা, কাড়াকাড়ির ভাইরাল হওয়া ঘটনাগুলো ঘটেছে সউদী আরব, বাহরাইন, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
সরকারি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, সমগ্র বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসাবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পোস্টাল ব্যালট নিবন্ধন হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে। হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে অংশগ্রহণ করতে দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে নিবন্ধন করেছেন চট্টগ্রামের প্রবাসী ৯৫ হাজার ২৪৬ জন ভোটার। এরমধ্যে সর্বাধিক পোস্টাল ব্যালট ভোটার চট্টগ্রাম (১৫) সাতকানিয়া লোহাগাড়া আসনের; যার সংখ্যা ১৪ হাজার ৩০১ জন ভোটার। অন্যান্য এলাকায়ও বড়সড় অংকের প্রবাসী ভোটার হয়েছেন পোস্টাল ব্যালটে।
লক্ষ্য করার মতো চমকপ্রদ যে, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিয়ন্ত্রণে ছাপা ও বিতরণ হওয়া পোস্টাল ব্যালটের শীর্ষ স্থানে ছাপা হয়েছে ‘দাঁড়ি পাল্লা’ মার্কা। আর সপ্তম লাইনে পোস্টাল ব্যালটের কাগজের মাঝখানে ভাঁজের মধ্যে ঠাঁই পেয়েছে কোনোমতে ’ধানের শীষ’ মার্কা। পত্র-পত্রিকার পাঠক ও নেটিজেনদের চোখ চড়কগাছ, কীভাবে দেশের সর্ববৃহৎ জনসমর্থনপুষ্ট একটি দল বিএনপির ‘ধানের শীষের’ জায়গাটা পোস্টাল ব্যালটের মাঝ বরাবর নেমে গেলো। তাও কী ভোটের আগে বিচিত্র ভোটের মহড়া?
তৃণমূলের সচেতন মানুষজনকে বলতে শোনা যাচ্ছে, পোস্টাল ব্যালট যেভাবে একটি বিশেষ দলের নেতা-কর্মীরা দখলে নিয়েছে তাতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হবেনা এমন গ্যারান্টি কে কীভাবে দেবে? পোস্টাল ব্যালটেই জামায়াতের দাঁড়ি পাল্লা ঊর্ধ্বে রেখে বিএনপির ধানের শীষের অবস্থান তলানিতে এসে যায় কীভাবে? কোন যুক্তিতে?
অন্যদিকে আগাম বিজয়োল্লাসের অঘোর ‘ঘুমে’ রয়েছে বিএনপি। দলটির টপ টু বটম নেতা-কর্মী এমনকি এমপি প্রার্থীদের বড় একটি অংশ চাটুকারিতা, তোষামোদ এবং অতি আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করে দম্ভ-আস্ফালনে মত্ত। ভাবখানা এমন যে আগামীকালই বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে; এখন শুধু ক্ষণ গণনার পালা। অথচ রাজনীতিতে গভীরভাবে ঋগ্ধ ও পরিপক্ক বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান অনেক দিন ধরেই নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে একটি পরিস্কার বার্তা দিয়ে আসছেন, ‘আসন্ন নির্বাচন যত সহজ ভাবা হচ্ছে বিষয়টি মোটেও তত সহজ হবে না। অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। এরজন্য সবস্তরের নেতা-কর্মীদের সজাগ ও প্রস্তুত হতে হবে’।
অথচ দলটির ব্যাপক অংশের নেতা-কর্মীদের ঘুম পাড়িয়ে জামায়াত তাদের পরিকল্পনার ছক মাফিক অগ্রসর হচ্ছে। প্রশাসন কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে জামায়াত। গোড়াতেই বিএনপির শীর্ষ নেতারা নির্বাচন কমিশনে (ইসি) বৈঠকে গিয়ে দাবি তুলেছিলেন যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার এবং সরকারি রিটার্নিং অফিসারদের নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু ইসি’র কাছে ধোপে টেকেনি বিএনপির যৌক্তিক দাবিটি। বিএনপিও শক্ত অবস্থানে যেতে পারেনি। আগের মতোই মাঠ প্রশাসন থেকেই নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার এবং সরকারি রিটার্নিং অফিসারদের নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। তাদের ওপর পেছন থেকে চেপে আছে বিশেষ একটি দলীয় ভূত। অতএব বুঝহ সুজন। “সময় গেলে সাধন হবে না”




