যে গ্রামে ঢুকতে মানুষকে খুলতে হয় পরনের কাপড়

বাংলা টাইমস ডেস্ক:

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ২ নম্বর উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের চর ঘাশিয়া গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ যেন শেষ হওয়ার নয়। গ্রামে প্রবেশ ও বের হওয়ার একমাত্র পথের সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে পানিতে ডুবে আছে এবং জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। জোয়ারের সময় সেতুটি পানিতে তলিয়ে যায়। তখন কখনও সাঁতরে, আবার কখনও কাপড় খুলে গামছা দিয়ে শরীর ঢেকে পানি পার হতে হয়। এমনকি জোয়ারের সময় সেতুর ওপর দিয়ে নৌকাও চলাচল করে।

প্রায় তিন বছর আগে সরকারি সহায়তা না পেয়ে গ্রামের মানুষ নিজেরাই টাকা তুলে ওই জায়গায় একটি ছোট সেতু নির্মাণ করে। কিন্তু নির্মাণের এক বছর পরই সেতুটির এক পাশ ভেঙে পড়ে। পরে এলাকাবাসী আবারও টাকা তুলে ভাঙা অংশটি সংস্কার করে। কিন্তু কিছুদিন পর সেতুটির অন্য পাশও ভেঙে পড়ে। বর্তমানে মাঝখানের অবশিষ্ট অংশটুকুও একদিকে হেলে রয়েছে।

চর ঘাশিয়া গ্রামের বাসিন্দা হেলাল মাঝি বলেন, ‘আমরা নিজেদের টাকা দিয়ে ব্রিজ বানিয়েছি, আবার ভেঙে যাওয়ার পর নিজেদের টাকা দিয়েই সংস্কার করেছি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে? এখন ব্রিজটি যে অবস্থায় আছে, যেকোনো সময় বাকি বাকি অংশটুকু ভেঙ্গে পড়বে।’

জোয়ারের সময় এ দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সেতুর ওপর দিয়ে এত পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয় যে অনেক সময় পুরো সেতুটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। তখন মানুষের পাশাপাশি ছোট নৌকাও ওই পথ দিয়ে চলাচল করে। জরুরি প্রয়োজনে অনেককে বাধ্য হয়ে সাঁতরে পার হতে হয়।

গ্রামের বাসিন্দা বিলকিস বেগম বলেন, ‘জোয়ারের সময় পানি বাড়লে বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে বের হতে ভয় লাগে। অনেক সময় কাপড় ভিজে যায়। তাই সঙ্গে গামছা রাখতে হয়। পানি বেশি হলে কাপড় খুলে গামছা দিয়ে শরীর ঢেকে পার হতে হয়। এটা আমাদের জন্য খুবই কষ্টের ও লজ্জার বিষয়।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামের অনেক মানুষের কাছেই এখন গামছা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মতো। বাইরে যাওয়ার সময় সঙ্গে গামছা রাখেন তারা। পানি বেশি থাকলে কাপড়-চোপড় ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় গামছা দিয়ে শরীর ঢেকে পানি পার হতে হয়।

স্কুলগামী শিশুদের দুর্ভোগও কম নয়। প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে তাদের স্কুলে যেতে হয়। জোয়ারের সময় পানি বেশি থাকলে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পান। বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

গ্রামের বাসিন্দা রাসেল মাঝি বলেন, ‘এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা চলাচল করেন। সেতুর মাঝের অংশ হেলে আছে। একটু অসাবধান হলেই পানিতে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা চাই দ্রুত এখানে একটি ভালো সেতু নির্মাণ করা হোক।’

এদিকে কৃষকরাও পড়েছেন বিপাকে। গ্রামের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু পার হতে হয়। কোনো রোগীকে জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে নিতে হলেও ভোগান্তির শেষ থাকে না।

স্থানীয় কৃষক বাবুল বেপারী বলেন, ‘আমার ক্ষেতের কৃষিপণ্য নিয়ে এই ব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ভ্যানগাড়িসহ পড়ে গিয়ে আমার হাতের আঙুল ভেঙে যায়। হাতের বিভিন্ন অংশ কেটে গুরুতর আহতও হয়েছি। আমরা কৃষক মানুষ, এই ব্রিজ দিয়েই নিয়মিত কৃষিপণ্য নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। তাই দ্রুত আমাদের চলাচলের জন্য একটি নিরাপদ ব্যবস্থা করা হোক।’

গৃহবধূ রাহিমা বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে যেতে হয়, বাজারে যেতে হয়, অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে হয়। কিন্তু ব্রিজের কারণে সবসময় ভয় নিয়ে চলাচল করতে হয়। সরকার যদি এখানে একটি স্থায়ী ব্রিজ করে দেয়, তাহলে আমাদের অনেক কষ্ট কমে যাবে।

এলাকাবাসীর দাবি, নিজেদের উদ্যোগে তৈরি করা সেতুটি এখন আর সংস্কার করে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তারা আপাতত একটি অস্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা চান। পাশাপাশি দ্রুত সরকারি উদ্যোগে সেখানে একটি স্থায়ী ও টেকসই সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

কুদ্দুস বেপারী বলেন, ‘আমরা অস্থায়ীভাবে হলেও একটি পারাপারের ব্যবস্থা চাই। আর সরকারের কাছে আমাদের মূল দাবি, এখানে দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু তৈরি করে দেওয়া হোক। তাহলে আমাদের গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে।’

চর ঘাশিয়া গ্রামের মানুষের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। জোয়ারের পানিতে সাঁতরে কিংবা কাপড় খুলে গামছা হাতে নয়, একটি নিরাপদ সেতু দিয়েই যেন তারা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে, এটাই এখন তাদের একমাত্র প্রত্যাশা।

Share This:
You might also like