দৌড়ের মধ্যেই জীবন, থামলে মৃত্যু

আবীর চক্রবর্তী

চট্টগ্রাম: ১০ বছর আগে যে দৌড় শুরু করেছিলেন নৃপেন চৌধুরী, সেটি থামেনি এখনও। প্রায় প্রতিদিনই নিয়ম মেনে তিনি দৌড়ান পার্কে, করেন শরীরচর্চা।
সুযোগ পেলে দৌড়ান বিদেশের মাটিতেও। এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে দূর হয়েছে শ্বাসকষ্ট, ৭৬ বছর বয়সে এসেও তাই তিনি চিরযুবা।
২০১৬ সালে নৃপেন চৌধুরীর দৌড়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম শহরের সিআরবি সাত রাস্তার মোড় থেকে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোর ৬টায় সেখান থেকেই হবে দৌড় যাত্রার ১০ বছর পূর্তিতে ১০ কিলোমিটার ফান রান।তাঁর সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন চট্টগ্রামের দৌড়প্রেমীরা। সিআরবি থেকে টাইগার পাস হয়ে চিটাগাং ক্লাব, কাজীর দেউড়ি, চট্টেশ্বরী সড়ক, চট্টগ্রাম কলেজ সড়ক, প্যারেড মাঠ সড়ক, আন্দরকিল্লা, চেরাগী পাহাড়, লাভ লেইন, বৌদ্ধ মন্দির সড়ক, স্টেডিয়াম ঘুরে আবারও সিআরবি এলাকায় পৌঁছে শেষ হবে দৌড়।

সাতকানিয়ার কেওচিয়া গ্রামে ১৯৫১ সালে জন্ম নৃপেন চৌধুরীর। মা দুর্গা চৌধুরী। বাবা জ্ঞানেন্দ্র লাল চৌধুরী ছিলেন হাইস্কুল শিক্ষক। বাবার কাছে শিখেছেন যোগব্যায়াম। ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে শুরু করেন ব্যবসা। ২০১০ সাল পর্যন্ত শহরের জামালখান এলাকায় থাকার সুবাদে ভোর হলেই দোর খুলে বেরিয়ে যেতেন মুক্ত বাতাসের সন্ধানে।

সেই সময়কার স্মৃতিচারণ করে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘বয়স বাড়ার সাথে সাথে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। নিয়মিত ইনহেলার নিতে হতো। ২০০০ সাল থেকে ভোরে হাঁটাহাটি করতাম। ২০১৬ সালে সিআরবি এলাকা থেকে দৌড় শুরু করি। আমাকে দৌড়াতে দেখে কেউ কেউ সঙ্গী হতো। ২০১৭ সালে সবাইকে উৎসাহিত করার জন্য ‘চট্টলা রানার্স’ নামের একটি সংগঠন করেছি। সদস্য ছিলাম ৩০-৫০ জন। এখন চট্টগ্রামেই রানারদের ১০-১৫টি সংগঠন হয়েছে। একসময় থিতু হই ঢাকায়। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় দৌড়াতে গিয়ে বিডি রানার গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হই। এখন ভোরে চন্দ্রিমা উদ্যানে কিংবা সড়কে দৌড়াই’।

নৃপেন চৌধুরীর স্ত্রী মিতা চৌধুরী প্রয়াত হন ২০২৪ সালে। তিনি ছিলেন স্বামীর ছায়াসঙ্গী। এখন আছেন দুই কন্যা, যাদের একজন দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং অন্যজন আমেরিকা প্রবাসী শিক্ষক। সময় মিললে তাঁরাও দৌড়ান বাবার সঙ্গে।

এ পর্যন্ত দেশ-বিদেশে ১০, ২১, ২৫, ৪২ ও ৫০ কিলোমিটারের ১৯০টির অধিক ইভেন্টে যোগ দিয়েছেন নৃপেন চৌধুরী। ভারতের কলকাতায় প্রথমবারের মতো ১০ কিলোমিটার ম্যারাথন দৌড় শেষ করেন ১ ঘণ্টা ৩ মিনিট ৪১ সেকেন্ডে। ১০ কিলোমিটার ৬০টি, ২৫ কিলোমিটার ৮টি, হাফ ম্যারাথন ৫৫টি, ম্যারাথন ৮টি এবং ৫০ কিলোমিটারের ১টি আল্ট্রাম্যারাথন শেষ করেছেন এই সময়ে। আগামী ২৭-২৯ জানুয়ারি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হবে এশিয়ান মাস্টার্স স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশীপ। সেখানে মাস্টার্স অ্যাথলেটদের সাথে ৫ হাজার মিটার দৌড়ে অংশ নেওয়ার কথা জানালেন তিনি।

বাংলানিউজকে বললেন- ‘বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলংকায় ম্যারাথনে দৌড়েছি। ২০২২ সালে ভারতে মাস্টার্স গেইমস কম্পিটিশনে সিনিয়রদের সাথে দৌড়েছি। ২০২৩ সালে বিশ্বের অন্যতম মেজর ম্যারাথন ‘ব্যাংক অফ আমেরিকা শিকাগো ম্যারাথন ২০২৩’ এবং একই সময়ে কোয়ালিফাই করে শিকাগোতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ‘অ্যাবট ওয়ান্ডা বয়সভিত্তিক ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ অংশগ্রহণ করেছি। ভারতের নৈনিতালে একমাত্র আল্ট্রাম্যারাথন করেছি। ঢাকায় ১টি, শ্রীলংকায় ১টি এবং ভারতে ৮টি এশিয়ান মাস্টার্স স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশীপে যোগ দিয়ে ২০টি গোল্ড মেডেল ও ১০টি সিলভার-ব্রোঞ্জ মেডেল পেয়েছি’।

দৌড়াতে গিয়ে নানান বয়সী মানুষ অবাক চোখে তাকিয়েছেন নৃপেন চৌধুরীর দিকে। কেউ বলেছেন, ‘ইউ রান লাইক এন ইয়াং ম্যান’। কেউ মিলিয়েছেন হাত, কেউবা জানতে চেয়েছেন এই বয়সে দৌড়ানোর সাহস পাওয়ার কারণ কিংবা সুস্থ থাকার রহস্য।

তাঁর ভাষায়, ‘আমি নিজেকে একজন সুখী মানুষ বলেই মনে করি। সুস্থ থাকার জন্য সচেতন জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য ও শৃঙ্খলার বিকল্প নেই। আর সুখী থাকার প্রথম শর্ত হলো- সন্তুষ্ট থাকতে শেখা। পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু, সংস্কৃতি, সমাজ ও মানবকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের সীমাবদ্ধতা ও চারপাশের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবনকে গ্রহণ করা। সুস্থতা অনেকটাই নিজের হাতে, আর সুখ অনেকটাই নির্ভর করে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টির ওপর’।

স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন শুরু করার জন্য কখনোই খুব দেরি হয়ে যায় না, তবে যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যায়, ততই ভালো। আমি ৬৫ বছর বয়সে শুরু করেছি, আপনার অজুহাত কী? যেসব তরুণ ও প্রবীণ এখনও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন শুরু করেননি, আমি তাঁদের আজ থেকেই শুরু করার আহ্বান জানাই। এর সুফল ভোগ করুন এবং আনন্দময়, পরিপূর্ণ জীবন উপভোগ করুন-বলেন নৃপেন চৌধুরী।

যে মানুষটা রোগমুক্ত থাকতে ২৫ বছর আগে হাঁটা শুরু করেছিলেন, তা দৌড়ে রূপ নেওয়ার পর অসুখ দূর হয়েছে। এখন লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০০টি ইভেন্ট শেষ করা। তাঁর মতে, ভালো পারফরম্যান্স ও ইনজুরিমুক্ত দৌড়ের জন্য প্রশিক্ষণে বৈচিত্র্য, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সঠিক ফুয়েলিং, স্ট্রেংথ ট্রেনিং ও ক্রস ট্রেনিং-সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। দৌড়ের মধ্যে থাকে যে জীবন, থামলেই হবে তার মৃত্যু।

Share This:
You might also like