রাঙামাটির শৈশব থেকে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য – অমিত চাকমার বিশ্বজয়
বাংলা টাইমস ডেস্ক:
বাংলাদেশের রাঙামাটি থেকে যাত্রা শুরু। এরপর আলজেরিয়ায় প্রকৌশল শিক্ষা, কানাডায় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা, তারপর একে একে কানাডার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব। সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার অস্ট্রেলিয়ার উচ্চশিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অধ্যাপক অমিত চাকমা।তিনি বর্তমানে দ্য ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার (UWA) উপাচার্য। ২০২০ সালের জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির ১৯তম ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া অমিত চাকমাকে ২০২৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্যও পুনর্নিয়োগ করা হয়, যার মেয়াদ শুরু হয়েছে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে।
অমিত চাকমার শৈশব ও শিক্ষাজীবনের শুরুর সময় কেটেছে বাংলাদেশে। রাঙামাটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও কুমিল্লার ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করার পর তিনি ১৯৭৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর আলজেরিয়ান সরকারের বৃত্তি নিয়ে দেশটির আলজেরিয়ান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করেন। ১৯৮২ সালে প্রাকৃতিক গ্যাস প্রসেসিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং নিজের শ্রেণিতে শীর্ষস্থান অর্জন করেন। পরে তাঁর শিক্ষাজীবনের গন্তব্য হয় কানাডা। ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স ও পিএইচডি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবনের পর গবেষণা ও শিক্ষকতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন অমিত চাকমা। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক হিসেবে তাঁর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিল গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক মডেলিং, পেট্রোলিয়াম বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গ্যাস পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মাস ট্রান্সফার। গবেষণার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেও দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে উঠে আসেন তিনি। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুর প্রভোস্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট একাডেমিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর আসে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিওর নেতৃত্ব। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় এক দশক তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রেসিডেন্ট ও ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। একই সময়ে কানাডার উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক শিক্ষানীতিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল। তিনি কানাডার U15 Group of Canadian Research Universities-এর প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ার ছিলেন এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা কৌশলবিষয়ক কানাডীয় সরকারের উপদেষ্টা প্যানেলেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি Association of Commonwealth Universities-এর কাউন্সিলের চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০২০ সালে তাঁর কর্মজীবনে আসে নতুন অধ্যায়। কানাডা ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে পাড়ি জমান অমিত চাকমা। ওই বছরের জুলাইয়ে তিনি দ্য ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। UWA-এর ইতিহাসে তিনি ১৯তম ভাইস চ্যান্সেলর। তখন তাঁর সামনে ছিল কোভিড-১৯ মহামারির মতো বৈশ্বিক সংকট। দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মীদের সঙ্গে কাজ করে মহামারির প্রভাব কাটিয়ে ওঠা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার শক্তিকে এগিয়ে নেওয়াকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে অমিত চাকমার নিয়োগ বাংলাদেশিদের জন্যও ছিল বিশেষ তাৎপর্যের। ২০২০ সালে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের সময় SBS বাংলা তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে উল্লেখ করে। একই প্রতিবেদনে তাঁর রাঙামাটিতে জন্ম এবং কানাডায় দীর্ঘ একাডেমিক ও প্রশাসনিক ক্যারিয়ারের তথ্য তুলে ধরা হয়।
তবে অমিত চাকমার পরিচয় শুধু একজন প্রশাসক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চশিক্ষায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নানা দায়িত্ব। তিনি Association of Commonwealth Universities-এর নেতৃত্বে ছিলেন, কানাডার আন্তর্জাতিক শিক্ষা কৌশল নিয়ে কাজ করেছেন এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের ট্রাস্টি বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও বিভিন্নভাবে অটুট রয়েছে। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি দেয়। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার তালিকায় কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলু থেকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডিএসসি-ও রয়েছে।
রাঙামাটির একজন শিক্ষার্থী থেকে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানোর এই পথ তাই এক দেশের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর শিক্ষাজীবন ছড়িয়েছে বাংলাদেশ, আলজেরিয়া ও কানাডাজুড়ে; কর্মজীবনের নেতৃত্ব বিস্তৃত হয়েছে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায়। আর সেই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্ব, যেখানে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া একজন শিক্ষাবিদ দ্বিতীয় মেয়াদেও উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন।
অমিত চাকমার নিজের জীবনকে যদি কয়েকটি ভূগোলে ভাগ করা হয়, তাহলে সেখানে রাঙামাটি শৈশবের ঠিকানা, আলজেরিয়া প্রকৌশলী হয়ে ওঠার অধ্যায়, কানাডা গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সময় এবং অস্ট্রেলিয়া আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা নেতৃত্বের নতুন অধ্যায়। সেই অর্থে তাঁর গল্পটি কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এটি সীমান্ত পেরিয়ে জ্ঞান, শিক্ষা ও নেতৃত্বের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে যাওয়ার গল্প।








