রংপুরে জাতীয় পার্টির দুর্গ ভাঙার নেপথ্যে
বাংলা টাইমস ডেস্ক:
রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে শোচনীয় পরাজয় হয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে গড়া জাতীয় পার্টির। কোনো আসনেই দলটির কোনো প্রার্থী জয়ের দেখা পাননি। জাতীয় পার্টির দুর্গ খ্যাত এ অঞ্চলে এর আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি তারা। তাই নির্বাচনের একদিন পরেই এ নিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের ভেতরই প্রশ্ন উঠেছে। তারা দলের এই বিপর্যয় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
জাতীয় পার্টির নেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের দলকে ধ্বংস করতে নানামুখী অপচেষ্টা চালিয়েছে। নির্বাচনের আগে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে আর্থিক সহযোগিতার নামে ভোটারদের প্রভাবিত করেছে।
নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এর মধ্যে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের রংপুর-৩ (সিটি ও সদর) আসনে তৃতীয় হয়েছেন। এই আসনে নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল। তিনি ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সামসুজ্জামান সামু পেয়েছেন ৭৪ হাজার ১৭১ ভোট। অন্যদিকে জিএম কাদের পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৫৩৩ ভোট। জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধার ২টি আসনে নির্বাচন করে দলের চেয়ারম্যানের চেয়ে কম ৩৪ হাজারের কাছাকাছি ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন। জাতীয় পার্টির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অভিমত, গত সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করায় জাতীয় পার্টি নিজেদের দলের নেতৃত্বের প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ হতে পারেনি। ফলে দলের স্বকীয়তা হারিয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দিতে গিয়ে দলটি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগের দোসর হিসাবে পরিচিত হলেও আওয়ামী লীগের ভোটাররা এবার জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে ভোট দেননি। দলের প্রার্থীরা আশায় ছিলেন আওয়ামী লীগের ভোটাররা শেষ পর্যন্ত তাদের ভোট দেবেন। কিন্তু ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলন হয়নি। এছাড়া জাতীয় পার্টি গত দুই দশক নেতানির্ভর দলে পরিণত হয়েছে। ভোটের সময় ত্যাগী নেতাকর্মীদের মতামত গ্রাহ্য না করে প্রার্থী নির্বাচনের নামে মনোনয়ন বাণিজ্যেরও অভিযোগ তোলেন তারা।
সবশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও জাতীয় পার্টি মাত্র ১১টি আসন পেয়েছিল, যা দলটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন ছিল। আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে ছিল না। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ও মিত্র অধিকাংশ দল ছিল ভোটের বাইরে। একমাত্র জাতীয় পার্টিই বিপুলসংখ্যক প্রার্থী দিয়ে ভোটে ছিল। রুহুল আমিন হাওলাদার, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু ও কাজী ফিরোজ রশিদের মতো হেভিওয়েট নেতারা ভোটের আগে আলাদা দল ঘোষণা করেন। কিন্তু তারা প্রতীক জটিলতায় ভোট করতে পারেননি। সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে দেখা যায়, ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৪ আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছিল। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ‘রাতের ভোট’র নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২২টি আসনে জয়লাভ করে। এ নির্বাচনে দলটি প্রধান বিরোধী দল হিসাবে সংসদে জায়গা করে নেয়। সবশেষ ২০২৪ সালে বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন ছিল ১১টি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কুড়িগ্রাম জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক লিয়াকত আলী, জেলা প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সভাপতি সামিউল হক নান্টু ও জেলা সুজনের সভাপতি খাইরুল আনামের মতে, জাতীয় পার্টি একটি দলের লেজুড়বৃত্তির কারণে নিজস্বতা হারিয়ে আজ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর মহানগর কমিটির সদস্য সচিব এসএম ইয়াসির যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দলকে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছে ভোটের চিত্রে তা স্পষ্ট হয়েছে। ভোটের আগে থেকেই ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক ও ঠ্যাঙ্গামারাসহ কয়েকটি এনজিও ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের আগে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে নানাভাবে আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করেছে। এ বিষয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত করার পরও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।




