মানছুরা আক্তার আঁখি’র গল্প “ছিন্নমূল”

মানছুরা আক্তার আঁখি

প্রতিদিন স্টেশনে বাকিদের মত ১০ বছরের রাশেদ ও পত্রিকা বিক্রি করে।মাকে নিয়ে স্টেশনের কাছে একটা বস্তিতে এক রুমের একটা ভাড়া বাসায় থাকে।ওর যখন ৩ বছর বয়স তখন তার বাবা তাদের ছেড়ে চলে যায়। পরে জানতে পারে সে অন্য একটা বিয়ে করেছে।এরপর থেকে রাশেেদর মা আমেনা ছেলেকে নিয়ে একা ই জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্চে।আমেনা মানুষের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে বড় করেছে।রাশেদ বস্তির কাছে একটা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে।মা-ছেলে মিলে মোটামুটি ভালই দিন কাটছিল তাদের।
প্রতিদিনের মত আজকে ও সকালে পত্রিকা বিক্রি করে ঘরে ফিরে আসে রাশেদ।
-মা, কই তুমি? খাবার দাও,স্কুলে যাব আমি।
-আমার শরীরটা ভালো নারে বাবা।বুকে খুব ব্যথা করছে।আমি মনে হয় আর বাঁচবোনারে বাপ।
-কি হয়েছে তোমার মা?এমন কথা কেন বলছো?কিছু হবেনা তোমার মা-বলেই রাশেদ কাঁদতে লাগলো।
-কাঁদিস না বাবা,আমার সময় মনে হয় শেষ।মরার আগে তোর একটা গতি করে যেতে পারলাম না,তোকে দেখার আর কেউ রইলোনা রে বাপ।
আমেনা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো।
রাশেদ ও মাকে জড়িয়ে ধরে রাখলো।কিছুক্ষণ পর রাশেদ বুঝতে পারলো তার মা আর কথা বলছেনা।
-মা,ও মা,মা গো কথা বলো,,
-কিন্ত তার মা যে আর কথা বলবেনা,
রাশেদ কাঁদতে শুরু করলো।
রাশেদের কান্নার আওয়াজে বস্তির লোকজন ছুটে এলো।তারা এসে দেখলো আমেনা মারা গেছে।তারা সাবাই মিলে আমেনার দাফনের কাজে সাহায্য করলো।
দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো রাশেদ সেই এক জায়গায় মায়ের কাপড় জড়িয়ে বসে রইলো।কাঁদতে কাঁদতে কখন যে সে ঘুমিয়ে গেলো টের পেলো না।
পরের দিন সকালে বাহিরে চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙ্গল তার।
ঘরের মালিক আবুল চাচা এসেছে।
তিনি রাশেদকে ঘর ছেড়ে দিতে বললেন আজকেই।আর ১মাসের ভাড়া দেওয়া হয়নি বলে চেঁচামেচি করতে লাগলেন।
-চাচা,আমি কোথায় পাব এখন টাকা?আমার কাছে তো কোন টাকা নেই।
-তা আমি কিভাবে জানবো বাঁছা?হয় আমার টাকা দেও না হয় এখুনি বাসা ছেড়ে চলে যাও।সাথে কিছু নিতে পারবেনা, এগুলো আমার ভাড়া শোধ এর জন্য রেখে দিলাম।
এই বলে তিনি রাশেদকে টেনে ঘর থেকে বের করে দিলেন।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়,রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রাশেদের খুব খিদে লাগে।খাবার কেনার জন্য কোন টাকা ও ছিলনা তার কাছে।
রাস্তার পাশে একটা কল থেকে পানি পান করে সেখানেই কিছুটা সময় বসে রইল।
কিছুদূরে একটা হোটেল দেখতে পেলো।
সেখানে গিয়ে সে হোটেলের ক্যাশিয়ারকে বললো-
আমায় কিছু খেতে দিবেন চাচা?কালকে রাত থেকে কিছুই খাইনি।
-টাকা আছে তোর কাছে?
-নাহ,নেই।
-তাহলে খাবার ও যে দিতে পারবোনা।যা তো এখান থেকে,বিরক্ত করিস না।টাকা নেই আসছে খাবার খেতে।
কই থেকে যে আসে এসব ছোকরা-ক্যশিয়ার বিরক্তিতে বিড়বিড় করতে লাগলো।
কোন উপায় না দেখে রাশেদ সেখান থেকে চলে এলো

সারাদিন খালি পেট নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় অনেক ঘুরলো কিন্ত টাকার বিনিময় ছাড়া কোন দোকানে ই খাবার পেলো না।
কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলোনা।
এভাবে সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যায় একটা ফ্লাইওভারের নিছে এসে বসলো।
সারাদিনের সব ঘটনা মনে পড়ে কাঁদতে লাগলো সে।মাকে খুব মনে পড়তে লাগলো।মা থাকলে আজ রাশেদকে এভাবে একটু খাবার আর আশ্রয়ের জন্য মানুষের কাছে সাহায্যে চাইতে হতোনা।
হঠাৎ তার কাঁধে একটা হাতের ছোঁয়া পেতেই মাথা তুলে দেখলো মাঝ বয়সী একটা লোক।

-কিরে ছেলে কাঁদসিস কেন?
রাশেদ প্রশ্ন শুনে আরো কাঁদতে লাগলো।
লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে।
কিছুক্ষণ পর সে লোকটিকে সব খুলে বললো।
-আরে কাঁদিস না। তোদের মত কত ছোকরাই এমন আসে।রাতের আঁধারে তোদের জন্য ই তো আমরা অপেক্ষা করি।চল আগে কিছু খেয়ে নে।তারপর তোর সাথে বাকি কথা হবে।
কিছু না ভেবেই রাশেদ লোকটির সাথে হাঁটতে লাগলো।
তারা একটা হোটেলে ঢুকলো।
লোকটি খাওয়ার অর্ডার দিলো।
সারাদিনে অনাহারে থাকার পর এই খাবারটুকু যেন অমৃত লাগলো রাশেদের।
-কিরে পেট ভরলো?
-জ্বি,পরম সন্তুষ্টির দৃষ্টিতে তাকালো রাশেদ।
-তো ছোকরা এবার কাজের কথায় আসি।তোকে একটা কাজ দিবো যদি সফল হোস তবে থাকা-খাওয়ার কোন চিন্তাই থাকবেনা।
কি করবি কাজ?
-কি কাজ?প্রশ্ন ভরা চোখে তাকিয়ে রইল রাশেদ।
-একটা ছোট কাজ।তার আগে বল চকবাজার এর ঐদিক চিনিস?
-জ্বি চিনি।মায়ের সাথে গিয়েছিলাম কয়েকবার।
-বাহ বেশ ভালো তাহলে।তোকে একটা প্যাকেট আর একটা ঠিকানা দিবো।তোর কাজ হলো এইটা ঠিকানামতো পৌঁছে দেওয়া, পারবি?
কিছু না ভেবেই সে উত্তর দিলো-পারবো,
এভাবে রাস্তায় অনাহারে ঘুরে না বেড়িয়ে একটা আশ্রয়ের আশায় রাজি হয়ে গেলো সে।
-কবে যেতে হবে?
-আজকে রাতেই,এখুনি বের হয়ে যা।
আর শুন যদি রাস্তায় পুলিশ বা কেউ জানতে চায় প্যাকেটে কি আছে বলবি খাবার আর তুই চকবাজারেই থাকিস।ভুলে ও যাতে আমার কথা না আসে। খুব সাবধানে যাবি। ওরা একটা কাগজ দিবে,এটা আমার কাছে নিয়ে আসবি।
আমি ফ্লাইওভারের কাছেই থাকবো।তুই এখানেই ফিরে আসবি।
পারবি সব?
-পারবো।
-সাব্বাস বেটা।
যা তাহলে,মনে রাখবি কোনভাবেই যেন কেউ টের না পায় আর আমার কথা একদম বলবিনা।

লোকটার কথাগুলি রাশেদের খুব খটকা লাগছিল।কিন্ত তার এতকিছু ভাবলে চলবেনা।
যেভাবেই হোক কাজটা করে ফিরে আসতে হবে।
এতে তার খাবার আর থাকার জায়গাটা পাওয়া যাবে।

অনেকক্ষণ হাঁটলো রাশেদ। চকবাজারের একটা গলির মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।মনে হলো কাছাকাছি চলে এসেছে। এতক্ষণে তার ভয় লাগতে শুরু করলো। এই জায়গাটা কেমন জানি নির্জন।
হঠাৎ একটা গাড়ির আলো দেখতে পেলো।
আলো একদম তার চোখের উপর এসে পড়াতে কিছু দেখলোনা।
কাছে এসেই গাড়িটা থেমে গেলো।
কয়েকজন পুলিশ গাড়ি থেকে নামল।
-কিরে ছোকরা এতরাতে এখানে কি?
-আমার বাসায় যাই স্যার।
-এইগলিতে তোর বাসা?
-জ্বি।
-প্যাকেটে কি তোর?
-খাবার স্যার।
একজন পুলিশ বললেো-দেখি তো তোর খাবার।এতরাতে কি খাবার নিয়ে যাচ্ছিস তুই।
এবার রাশেদের খুব ভয় হতে লাগলো।সে নিজেই তো জানেনা এতে কি আছে।
ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ তার হাত থেকে প্যাকেট নিয়ে নিল।
প্যাকেট খোলার পর যা দেখলো তার সম্পর্কে রাশেদের কোন ধারনা ই নেই।জীবনে এখন ও এমন জিনিস দেখেনি।
-কিরে এই হেরোইন ই তোর খাবার?এটা ই নিচ্ছিলি?
কতদিন চলে এই ব্যবসা?
-স্যার আমি কিছু জানিনা।হেরোইন কি আমি তো তা ও জানিনা।

-জানিস তো সবই।শুধু স্বীকার করবিনা। সমস্যা নাহ।থানায় নিয়ে গেলে আর দুই ঘা পড়লে সব ই বের হবে।
থানায়?-এবার রাশেদ কাঁদতে শুরু করলো।
আর বলতে লাগলো- আমি কিছু জানিনা স্যার,আমার কোন দোষ নাই আমারে ছেড়ে দেন স্যার।
কিন্ত কিছুতেই কিছু হলোনা রাশেদকে পুলিশ থানায় ধরে নিয়ে গেলো।
থানায় নিয়ে তাকে খুব মারা হলো।তার স্বীকারোক্তিনুযায়ী সেই লোকটাকে খোঁজা হলো।সাথে ঠিকানুযায়ী তল্লাশী দেওয়া হলো।
কিন্ত কাউকে পাওয়া গেলোনা।রাশেদের গ্রেপ্তার হওয়ার খবর তাদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলো হয়তো।
পরেরদিনের সংবাদপত্রের হেডলাইন হলো-
“১০ বছরের ছেলে কোটি টাকার হোরোইনসহ গ্রেপ্তার”
সকালের শুরুটা সবার এমন সংবাদ দিয়ে যা পড়ে মানুষের মন্তব্য -আজকাল মা-বাবা ছেলে ছোকরাদের শাসন করে না।
আবার কেউ বা বলছে ছেলেদের কি আর কথা শুনানো যায় এরা কথা না শুনে বখে গিয়ে এসব কাজে জড়িয়ে পড়ে।
শুধু নানা মানুষের নানা মন্তব্যের আড়ালে এমন ও হাজার ও রাশেদের অজানা গল্পগুলো পড়ে থাকে।যার সত্যতা কেউ কখন ও উদঘাটন করতে যায়না।
জীবনের মূলেই এরা কঠিন সত্যের মুখে পড়ে হয় পথশিশু হয়ে জীবন কাটায় না হয় অপরাধ জগৎ এ ডুবে যায়।
জীবনে সূচনা লগ্নেই এমন হাজার ও রাশেদ ছিন্ন হয়ে পড়ে তাদের আপন মূল থেকে।

Share This:
You might also like