বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তীদের নিয়ে কিছু কথা
ফজলে এলাহী
Bangla News: আমাদের নব্য সিনেমাওয়ালাদের যদি জিজ্ঞেস করেন যে – ‘চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে’, ‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘পাখির বাসার মতো দুটি চোখ তোমার’, ‘চোর আমি ডাকু আমি বলনারে’, ‘দুনিয়াটা মস্ত বড়’, ‘আমার পৃথিবী তুমি’, ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ আমার বসন্ত’, ‘তুল তুলা তুলতুল আমি লাল গোলাপ ফুল’…এর মতো অসংখ্য গানগুলো কি শুনেছেন? জবাবে ‘হ্যাঁ’ শুনবেন নিশ্চিত কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন উল্লেখ্য গানগুলো কে লিখেছেন তখন দেখবেন মুখ কাচুমাচু করে মাথার চুল চুলকাতে লাগবে কিন্তু সঠিক উত্তর একজনও দিতে পারবে না।কেউ বলতে পারবে না যে উল্লেখিত জনপ্রিয় গানগুলো লিখেছেন দেওয়ান নজরুল যিনি শুধুই একজন গীতিকার নন ,কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা ও এবং একজন ডায়নামিক পরিচালক।
ঠিক একই ভাবে ঐ নব্য সিনেমাওয়ালারা বলতে পারবেনা ‘আমার গানখানি যদি ভালো লাগে’, ‘খোদা তোমার এ দুনিয়ায় আমি এক এতিম অসহায়’,’তুমি আমার মনের মাঝি’, ‘চোখের জলে আমি ভেসে চলেছি’, ‘ভবের এই খেলাঘরে খেলে সব পুতুল খেলা’, ‘প্রেমের সমাধি ভেঙ্গে’ এর মতো অসংখ্য কালজয়ী গানের গীতিকার ছিলেন দেলোয়ার জাহান ঝন্টু যিনিও একাধারে ,কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা ও পরিচালক ছিলেন।দেলোয়ার জাহান ঝন্টু শুধুই নিজের পরিচালিত সিনেমার জন্যই কাহিনী,সংলাপ,চিত্রনাট্য ও গান রচনা করতেন না অন্য পরিচালকদের নির্মিত সিনেমাগুলোর জন্য লিখে যেতেন। অসংখ্য পরিচালকের অসংখ্য সফল সিনেমাগুলোর পেছনে আছে দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর অবদান। ১৯৯০ সালে দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর লিখা কাহিনীর ‘গরীবের বউ’ নির্মান করে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন পরিচালক কামাল আহমেদ।
আরও বলতে পারবে না ‘মানুষ নিস্পাপ পৃথিবীতে আসে’, ‘বেলি ফুলের মালা পড়ে’, আমারে তুই প্রেম শিখাইয়া’ এর মতো আরও অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকার ছিলেন কবির আনোয়ার যিনিও ,কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা, প্রযোজক ও পরিচালক ছিলেন । …অর্থাৎ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের সবচেয়ে গুরুত্তপুর্ন বিষয়গুলো ছিলো তাঁদের নখদর্পনে।এমন উদাহরন আরও আছে যাদের মধ্য ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যক্তিত্বদের তালিকায় থাকা খান আতাউর রহমান, আমজাদ হোসেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও আহমেদ জামান চৌধুরীর মতো মহিরুহরা।
খান আতাউর রহমান অভিনয় ও চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি নিজের চলচ্চিত্রের জন্য গান লিখতেন ও সুর করতেন। তাঁর লিখা ‘এক নদি রক্ত পেরিয়ে’, ‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে’, ‘সব সখিরে পার করিতে নেবো আনায় আনা’, ‘শ্যামল বরন মেয়েটি’, ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে’, ‘গুন গুন গান গাহিয়া নীল ভ্রমরা যায়’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘এসো সবাই মিলে দুখের কথা ভুলে’ এর মতো অসংখ্য কালজয়ি গানের গীতিকার ও সুরকার খান আতাউর রহমান। চলচ্চিত্রে অভিনয় ও পরিচালনার কথা বাদ দিলে শুধু গান দিয়েই খান আতাউর রহমান বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্মরনীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে থাকবেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আমজাদ হোসেন এক কিংবদন্তীর নাম। যিনি গোলাপী এখন ট্রেনে, নয়নমণি,সুন্দরী,জন্ম থেকে জ্বলছি, কসাই, দুই পয়সার আলতা, ভাত দে, সখিনার যুদ্ধ, আদরের সন্তান এর মতো অসংখ্য কালজয়ি সিনেমার নির্মাতা ও উল্লেখিত সবগুলো সিনেমার কাহিনী,সংলাপ,চিত্রনাট্য ও গান রচয়িতা ছিলেন। আমজাদ হোসেনের সিনেমাগুলোর কথা বাদ দিলে ‘আছেন মোক্তার’, ‘হায়রে কপাল মন্দ’, ‘কেউ কোনদিন আমারে তো কথা দিলো না’, ‘আমি আছি থাকবো ,ভালোবেসে মরবো’, তোমারই দুনিয়ায় দেখিয়া শুনিয়া’, ‘চুল ধইরো না খোঁপা খুলে যাবে’, ‘বন্ধু তিনদিন তোর বাড়িত গেলাম’, ‘বাড়ির মানুষ কয় আমার ভুতে ধরেছে’, ‘এমনও তো প্রেম হয়, চোখের জলে কথা কয়’, ‘এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই’, ‘তিলে তিলে মইরা যাইমু’, ‘কত কাঁদলাম কত গো সাধলাম’, ‘কেন তারে আমি এতো ভালোবাসলাম’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’, বাবা বলে গেলো আর কোনদিন’, ‘দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়’, ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো’ এর মতো অসংখ্য জনপ্রিয় ও কালজয়ী গানগুলোর গীতিকার হিসেবে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
বাংলা গানের সর্বকালের সেরা গীতিকারদের তালিকায় যে নামটি শীর্ষে থাকবে তিনি গাজী মাজহারুল আনোয়ার।‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একবার যেতে দেনা আমার ছোট্ট সোনার গায়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে আমায় বল’, ‘গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে’, ‘সাতটি রঙের মাঝে আমি মিল খুঁজে না পাই’, ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’…এর মতো আরও অসংখ্য অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় ও কালজয়ী গানের গীতিকার হলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার যিনি চলচ্চিত্রের গানের জন্যই ৫ বার শ্রেষ্ঠ গীতিকারের জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গানের কথা বাদ দিলে প্রযোজক, পরিচালক, কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা ও চিত্রনাট্যকার হিসেবেও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে থাকবেন চিরকাল। প্রযোজক হিসেবে গাজীর ‘দেশ চিত্রকথা’ নামের একটি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ছিলো। দেশ চিত্রকথা থেকে গাজী মাজহারুল আনোয়ার ৪২ টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন যার সবগুলোতে তিনি পরিচালক হিসেবে ছিলেন না। গাজী মাজহারুল আনোয়ার প্রযোজিত ও পরিচালিত ছবিগুলো হলো –শাস্তি, স্বাধীন, শর্ত, সমর, শ্রদ্ধা, ক্ষুধা, স্নেহ, তপস্যা, উল্কা, আম্মা, পরাধীন,আর্তনাদ,পাষাণের প্রেম, এই যে দুনিয়া, । পরিচালনা করেননি কিন্তু ছবি প্রযোজনা করেছেন সেই ছবিগুলো হলো সমাধান,অগ্নিশিখা, অনুরোধ, জিঞ্জির, আনারকলি, নানটু ঘোটক, চোর, বিচারপতি, সন্ধি, স্বাক্ষর ছবিগুলো । গাজী শুধু নিজের নির্মিত সিনেমাগুলোর জন্যই কাহিনী লিখতেন না অন্য যে কোন প্রযোজনা সংস্থা থেকে নির্মিত যে কোন পরিচালকদের সিনেমার জন্যও অনেক কাহিনী,চিত্রনাট্য,সংলাপ ও গান রচয়িতা করেছিলেন ।
বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের পর্দার পেছনে থাকা সেরা মেধাবী ও কিংবদন্তীতুল্য মানুষগুলোর অন্যতম একজন যার নাম আহমেদ জামান চৌধুরী । যাকে চলচ্চিত্রের সবাই ‘’আজাচৌ’’ নামে ডাকতো । বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে জনপ্রিয় করার পেছনে এই মানুষটির অবদান অনস্বীকার্য যিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ ও চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ছিলেন । ৭০ – ৯০ দশক এই তিনটি দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে প্রতিনিধিত্ব করা জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘’চিত্রালী’র সম্পাদক ছিলেন এই আহমেদ জামান চৌধুরী। আহমেদ জামান চৌধুরী হলেন বাংলাদেশের সোনালি যুগের বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার গীতিকার ও সংলাপ রচয়িতা ।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আহমেদ জামান চৌধুরীর লেখা প্রথম কাহিনী চিত্রনাট্য ‘ছবি নতুন নামে ডাকো।’ এছাড়াও তাঁর লিখা গল্প ও চিত্রনাট্যে দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে পিচঢালা পথ, নাচের পুতুল, বাঁদি থেকে বেগম, আগুন,মাস্তান, তুফান, যাদুর বাঁশি , শেষ উত্তর, লাভ ইন সিঙ্গাপুর, শ্বশুর বাড়ি, মিস লঙ্কা, রাতের পরদিন, দূরদেশ, সুখ-দুঃখের সাথীসহ, রাঙা ভাবী’র মতো অনেক সুপারহিট চলচ্চিত্র। তাঁর লিখা কাহিনী ও সর্বপ্রথম প্রযোজিত ‘’যাদুর বাঁশি’’ চলচ্চিত্রটি শুধু দর্শক নন্দিত হয়নি পেয়েছিল একাধিক শাখায় জাতীয় পুরস্কার । তিনি এ যাবৎ শতাধিক চলচ্চিত্রের কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখে ঢাকার চলচ্চিত্রকে করেছেন ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ। তাঁর লেখা ব্যাপক জনপ্রিয় কিছু গানের মধ্যে রয়েছে পিচঢালা এ পথটারে ভালবেসেছি, যেও না সাথী, নতুন নামে ডাকবো তোমায়, কে তুমি এলে গো, ও দরিয়ার পানি, এ বৃষ্টিভেজা রাতে চলে যেও না, চুরি করেছো আমার মনটা, মাগো তোর কান্না আমি সইতে পারি না, যাদু বিনা পাখি যেমন বাঁচিতে পারে না, এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি কেন একা বয়ে বেড়াও, বিদায় দাওগো বন্ধু তোমরা এবার দাও বিদায়, প্রেম পিরিতি চাই বলে সবাই আমায় পাগল বলে, আমার যা কিছু সবই যে তোমার জন্য , তোমাদের এই খুশির আসর , রাঙাভাবী মা বাঁধন খোলো না …… প্রভৃতি। রাজ্জাক এর ”নায়করাজ” , মাসুদ পারভেজ এর ‘সোহেল রানা ‘ নাম ও ‘ড্যাশিং হিরো’ উপাধি, উজ্জ্বলের ‘ মেগাস্টার’’ , ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘’ সুপারস্টার’’, শাবানার ‘’বিউটি কুইন’’, জাসিমের ‘’অ্যাকশন কিং’’ , পরিচালক এ জে মিন্টুকে ‘’মাস্টার মেকার’’ সহ জনপ্রিয় সকল ব্যক্তিবর্গের উপাধিগুলো এই মানুষটারই দেয়া তা হয়তো অনেকেই জানেন না।
উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ সকলেই ছিলেন বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রকে সময়ের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অগ্রপথিক।যারা প্রত্যেকেই নিজেরা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির জন্য ছিলেন জীবন্ত প্রতিষ্ঠান।গত প্রায় ২ দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে দেশী বিদেশী পুরস্কারপ্রাপ্ত অনেক নির্মাতাদের আমরা পেয়েছি কিন্তু উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের মতো পরিপুর্ন চলচ্চিত্রকার পাইনি যারা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এই ক্রান্তিকালে আশার আলো দেখাবেন।মাঝে মাঝে এই ভেবে বিস্মিত হই এই ভেবে যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রইন ইন্ডাস্ট্রি এক প্রজন্মেই সব অসাধারণ মেধাবী মানুষগুলো পেয়েছিলো যাদের বিকল্প বা সমকক্ষ এখন পর্যন্ত ২য় আরেকজন পেলো না।আজকে যারা তথাকথিত বাণিজ্যিক সিনেমা নির্মান করছেন তাঁরা যদি এই উক্ত মেধাবী মানুষগুলোর সম্পর্কে না জানে, না শিখে তাহলে কখনও এই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে ধারণা পাবেনা,এদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস সম্পর্কে পরিপুর্ন জানতে পারবে না।তথাকথিত দেশী বিদেশী পুরস্কার পেলেই মানুষ বেঁচে থাকেনা, মানুষ বেঁচে থাকে তাঁর কর্মে। উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গরা চিরদিন এই দেশের শিল্প, সংস্কৃতিতে ও মানুষের মনে বেঁচে থাকবেন তাঁদের কর্মগুনে।




