যে বাংলোয় জন্ম নিয়েছিল সুর, এখন সেখানে স্বাদের আয়োজন

Bangla Times Desk:

মুম্বাইয়ের জুহুর অভিজাত এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা ‘গৌরী কুঞ্জ’ শুধু একটি বাংলো নয়, এটি যেন হিন্দি সিনেমার সোনালি দিনের এক জীবন্ত স্মারক। একসময় এই বাড়ির প্রতিটি কোণ জুড়ে ছিল কিংবদন্তি শিল্পী কিশোর কুমারের সুর, হাসি আর সৃজনশীলতার ছোঁয়া। এখন সেই একই ঠিকানার একটি অংশে চলছে ক্রিকেট তারকা বিরাট কোহলির রেস্তোরাঁ ‘ওয়ান৮ কমিউন’।

কিশোর কুমার যাঁর কণ্ঠ, অভিনয় আর অদ্ভুতুড়ে ব্যক্তিত্ব আজও কোটি ভক্তের মনে জায়গা করে আছে। তিনি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন এই বাংলোয়। তাঁর গানের সুর, একান্ত মুহূর্তের ভাবনা আর প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডার অনেক স্মৃতির সাক্ষী এই বাড়ি।

মায়ের নামে রাখা হয়েছিল নাম

নিজের মা গৌরী দেবীর নাম অনুসারে বাংলোটির নাম রেখেছিলেন কিশোর কুমার। তাঁর কাছে গৌরী কুঞ্জ শুধু থাকার জায়গা ছিল না। বরং ছিল স্বপ্ন, সৃষ্টিশীলতা ও নিরিবিলি জীবনের আশ্রয়।

সবুজে ঘেরা পরিবেশ, পুরোনো দিনের গাড়ি আর শান্ত আবহ সবকিছু মিলিয়ে এই বাড়ি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বেরই প্রতিচ্ছবি। ব্যস্ত চলচ্চিত্রজগতের কোলাহল থেকে দূরে এখানে বসেই তিনি সুর তৈরি করতেন, সময় কাটাতেন প্রকৃতির সঙ্গে।

তারকার বাড়ি নয়, ছিল শান্তির ঠিকানা

কিশোর কুমারের ক্যারিয়ারের শীর্ষ সময়ে তৈরি হয়েছিল গৌরী কুঞ্জ। তবে এটি কোনও আড়ম্বরপূর্ণ তারকা-বাড়ি হিসেবে নির্মিত হয়নি। বরং লক্ষ্য ছিল এমন একটি জায়গা তৈরি করা, যেখানে পাওয়া যাবে শান্তি ও সৃজনশীলতার অবকাশ।

বাড়িটির নকশায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল খোলামেলা জায়গা, প্রাকৃতিক আলো এবং সবুজ পরিবেশকে। বিস্তীর্ণ লন ও খোলা উঠান তৈরি করেছিল এক প্রশান্ত আবহ, যা কিশোর কুমারের প্রকৃতিপ্রেমী ও কিছুটা নির্জন জীবনযাপনের সঙ্গে মানানসই ছিল।

গাছের সঙ্গে ছিল বন্ধুত্ব

কিশোর কুমারের অদ্ভুত ও মজার স্বভাবের গল্প বললে গৌরী কুঞ্জের প্রসঙ্গ আসবেই। ১৯৮৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, বাগানের গাছগুলোকে তিনি নিজের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী মনে করতেন। অনেক গাছের নামও দিয়েছিলেন তিনি। অবসরে প্রায়ই একা বাগানে বসে সময় কাটাতেন।

নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তিনি ছিলেন খুবই সতর্ক। তাই বাংলোর ফটকে একটি সাইনবোর্ডও লাগিয়েছিলেন ‘বি-ওয়্যার অব কিশোর’, অর্থাৎ ’কিশোর থেকে সাবধান’। তাঁর রসিকতা ও ব্যতিক্রমী মানসিকতার আরেকটি উদাহরণ হয়ে আছে এই ঘটনা।

সুরের মানুষদের আড্ডাখানা

গৌরী কুঞ্জ ছিল সংগীত ও সৃষ্টিশীলতার এক প্রাণকেন্দ্র। চলচ্চিত্রের বন্ধু, সুরকার ও সহশিল্পীদের আনাগোনা ছিল এই বাড়িতে। বড় তারকা হয়েও কিশোর কুমার পছন্দ করতেন সহজ-সরল জীবন। তাঁর সেই জীবনদর্শনের প্রতিফলন দেখা যেত এই বাংলোর পরিবেশে।

পুরোনোর সঙ্গে নতুনের মেলবন্ধন

২০২২ সালে গৌরী কুঞ্জের একটি অংশে চালু হয় বিরাট কোহলির ‘ওয়ান৮ কমিউন’। নতুন ব্যবহারের জন্য জায়গাটিকে আধুনিকভাবে সাজানো হলেও, এর পুরোনো আবহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

রেস্তোরাঁর নকশায় রয়েছে কাঠের উষ্ণতা, পিতলের সাজসজ্জা, বড় কাঁচের জানালা এবং সবুজ গাছপালার উপস্থিতি। দিনের আলো সহজে প্রবেশ করে এমন খোলামেলা নকশা কিশোর কুমারের প্রিয় বাড়িটির প্রকৃতিনির্ভর সৌন্দর্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আজ গৌরী কুঞ্জ নতুন পরিচয়ে পরিচিত হলেও, এর দেয়াল ও পরিবেশে এখনও রয়ে গেছে এক কিংবদন্তি শিল্পীর স্মৃতি। একদিকে আধুনিক রেস্তোরাঁর ব্যস্ততা, অন্যদিকে কিশোর কুমারের সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার দুই সময়ের এক অনন্য মিলনস্থল হয়ে আছে এই বাংলো।

Share This:
You might also like