মানছুরা আঁখি’র গল্প “গোধূলি”

“গোধূলি”
মানছুরা আঁখি

বাগিচাগাঁও-এর গলির শেষ মাথায় একটা পুরাতন দোতলা বাড়ি। বাড়িটা একটু পুরাতন ধাঁচের। বাড়ির ভেতরে একটি সুন্দর ফুলের বাগান, এর সাথে নানা জাতের ফল গাছের সমারোহ। বাড়িটি নানা রকম পুরাতন আসবাব পত্র দিয়ে সজানো। বাড়িটির চারটি ঘর নিচতলায়, আর দোতলায় দুটি।

বাড়ির সবগুলো ঘর আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো। সব মিলিয়ে মোটামুটি পরিপাটিভাবে গোছানো। এই বাড়িটি জামাল সাহেবের, যিনি বর্তমানে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।

পুরো বাড়িতে জামাল সাহেব আর তার কেয়ারটেকার মোখলেস থাকেন। জামাল সাহেবের দেখাশুনা মোখলেসই করে।

জামাল সাহেব এই বাড়িতে একাই থাকেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে উনার। দুই জনই বিবাহিত। বড় ছেলে জাবেদ আর মেয়ে মিনা। বর্তমানে তারা আমেরিকাতে বসবাসরত। জাবেদের এক মেয়ে আর মিনার এক মেয়ে ও এক ছেলে। স্ত্রী জাহানারা বেগম দুই বছর আগে ক্যান্সারে মারা যান। দীর্ঘদিন যাবৎ তিনি এই রোগে ভোগছিলেন। বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে। কিন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর জামাল সাহেব অনেকটা ভেঙ্গে পড়েন। কিছুদিন পর্যন্ত জাবেদ আর মিনা তার কাছে ছিল। কিন্ত কর্মক্ষেত্রে পৌঁছানোর তাগিতে দুজনকেই ফিরে যেতে হয় আমেরিকায়।

কিছুদিন পরপর তারা ফোনে খোঁজ নেয় জামাল সাহেবের। এবং প্রত্যেক মাসে তারা জামাল সাহেবের জন্য নির্দিষ্ট পরিমানের টাকা পাঠায়। তিনি সে টাকা এলাকার একটি এতিমখানায় দান করেন। এছাড়া পেনশনের একটা অংশও তিনি গরীব-দুঃখীদের জন্য দান করেন।

প্রতিদিন সকালে নামায পড়ে জামাল সাহেব বাগানের পরিচর্যা করেন। এই কাজটিতে মোখলেস তাকে সাহায্য করে। এরপর চা খেতে খেতে দোতলার বারান্দায় বসে সকালের খবরের কাগজ পড়েন।

জামাল সাহেব বেশ গোছানো আর পরিপাটি। নিজের কাজগুলো তিনি খুব গুছিয়ে করে থাকেন। অগোছালো কাজ একেবারেই পছন্দ করেন না। এই গুনের জন্য চাকরিকালীন সময় তার বেশ সুনাম ছিল।

প্রায় দশ দিন পর আজ ছেলে জাবেদ ফোন করেছেন। স্বাভাবিকভাবে দুই/তিন দিন পরপরই ফোন করে। এবার একটু দেরিতেই করেছে।
-আসসালামুআলাইকুল বাবা।
-ওয়ালাইকুম আসলাম।
-কেমন আছেন আপনি? শরীর কেমন আপনার?
-ভালো আছি। তোমরা কেমন আছো?
-জ্বি,ভালো। বাবা কাজের এতো চাপ যে অনেকদিন আপনার খোঁজ নিতে পারছিনা। আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন ঠিকমত।
– আচ্ছা। আর কিছু বলবে?
-না, বাবা। দোয়া করবেন আমাদের জন্য। আর যা প্রয়োজন হবে মোখলেসকে বলবেন।

– আচ্ছা রাখি তাহলে। ভালো থেক তোমরা।
ফোনটা রেখে জামাল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
ছেলে-মেয়ে বড় হলে কত দুরত্ব বাড়ে। চাইলেও ওদের কাছে যাওয়া যায় না।

গত দুই বছর যাবৎ তারা কেউই আসতে পারেনি। বাবার একাকিত্ব দেখে তারা বৃদ্ধাশ্রমে রাখতে চেয়েছিল। কিন্ত তিনি রাজি হননি। স্ত্রী-সন্তানের স্মৃতিজড়ানো এই বাড়ি ছেড়ে যেতে চাননি তিনি। এই বাড়িতেই রয়ে গেছেন।

কিছুদিন যাবৎ জামাল সাহেবের আচরনে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করল মোখলেস। ইদানিং জামাল সাহেব পুরাতন জিনিসগুলো ফেলে দিতে চান না।সবগুলো জমিয়ে রাখেন। এছাড়া তিনি বেশ অপরিচ্ছন্ন আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকছেন।যেখানে অপরিচ্ছন্ন বা নোংরা জিনিস দেখলেই তিনি রেগে যেতেন, সেখানে তিনি নিজেই এমন পরিবেশে থাকতে পছন্দ করছেন।

তিনি খুব একটা বাহিরে বের হন না। নিজের ঘরেই থাকেন। মাঝে মাঝে পুরাতন জিনিসের খোঁজে বাগানে যান। কথা বলেন না তেমন। বাগানের পরিত্যক্ত পুরানো জিনিসগুলো তিনি সাবলীলভাবে ঘরে এনে রাখেন। পুরানো বোতল, ভাঙ্গা টব, পুরাতন বই প্রভৃতি জিনিসগুলো যেন তার নিত্যসঙ্গী। সারাদিন মেজাজ খুব খিটখিটে থাকে।কথা বলা যায় না।

মোখলেস খুব চিন্তায় পড়ে যায়। জামাল সাহেব কাজের জন্য মোখলেসের কোন সাহায্য নিচ্ছেন না। মোখলেস জামাল সাহেবের পারিবারিক ডাক্তার আনিস রহমানকে বিষয়টি জানালো। আনিস রহমান জামাল সাহেবের ঘরে ডুকে তার এমন অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গেলেন। খাবার, ঔষধে অনিয়মের ফলে জামাল সাহেবের স্বাস্থ্যের অবনতি হতে লাগলো। প্রেসার চেক করে আনিস রহমান বেরিয়ে আসলেন।

আনিস রহমানের সাথে তিনি খুব একটা কথা বললেন না। অবস্থা খুব একটা সুবিধার দেখলেন না আনিস রহমান। তিনি মোখলেসকে উনার খেয়াল রাখতে বললেন।

চেম্বারে এসে আনিস রহমান তার বন্ধু করিম সাহেবকে বিষয়টি জানান। করিম সাহেব একজন সাইকোলজিস্ট। সব শুনে তিনি জামাল সাহেবের সাথে দেখা করতে চাইলেন। পরের দিন করিম সাহেব উনার বাড়ি আসলেন।
-কেমন আছেন জামাল সাহেব?
প্রথমে কোন উত্তর দিলেন না তিনি। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করার পর বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিলেন “ভালো”।
করিম সাহেব কথা বাড়ালেন না। পরিবেশ আর রোগীকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষন করে তিনি বের হয়ে আসলেন।
নিচতলায় বসার ঘরে আনিস রহমান উনার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
-কেমন দেখলে করিম?
-আমার যা মনে হলো তাতে মনে হচ্ছে জামাল সাহেব “ডিওজেনাস সিনড্রোম”- নামক একধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
-ডিওজেনাস সিনড্রোম? -একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন আনিস রহমান।
-হ্যাঁ। এই রোগটি হলে রোগীর পুরাতন জিনিস জমিয়ে রাখার প্রবনতা তৈরি হয়। এটি মূলত বয়স্কদের মধ্যেই দেখা যায়।

আমেরিকার এক গবেষণায় দেখা যায় ৬০ বছরের উপরে ০.০৫ শতাংশ আমেরিকানরা এই রোগে আক্রান্ত হয়। এটি দুই ধরনের হয়ে থাকে, প্রাইমারি ধরন হলো-রোগীর নিজের থেকে তৈরি হয়।
সেকেন্ডারি হলো-রোগটি কোন মানসিক রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়।

-জামাল সাহেবের ক্ষেত্রে তুমি কোনটা বুঝছো?কেন এমন সমস্যা তৈরি হলো উনার?
-লক্ষণ দেখে মনে হলো-প্রাইমারি টাইপ।
দীর্ঘদিন একা থাকার ফলে আর পারিবারিক পরিবেশ থেকে দূরে থাকার ফলে জামাল সাহেবের এমন সমস্যা তৈরি হয়েছে। একাকিত্বের ফলে মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছেন।
-এর কোন চিকিৎসা নেই?
-নাহ। মেডিক্যাল গবেষনায় এখনও এর কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। তবে নিয়মতান্ত্রিক জীবন আর পারিবারিক পরিবেশ এই রোগিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। আসলে আমাদের দেশে পূর্বে এই রোগটি না থাকলে ও বর্তমানে অনেকাংশেই দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক দূরত্ব আর আধুনিকতার বিস্তারতায় পরিবারের বয়ঃজ্যোষ্ঠরা এতে আক্রান্ত হচ্ছেন।
-হ্যাঁ, ঠিক বলেছ করিম।

জামাল সাহেবের ছেলে -মেয়েকে খবর পাঠানো হলো। সপ্তাহখানেকের মধ্যে তারা দেশে ফিরে আসলো। নাতি-নাতনী, ছেলে-মেয়ে সবাইকে কাছে পেয়ে জামাল সাহেব কিছুদিনের মধ্যে স্বাভাবিক হতে শুরু করলেন। মাসখানেকের মধ্যে উনার অনেকটা মানসিক উন্নতি হলো। এখন বেশ আগের মতো সকালে বাগান পরিচর্যা করেন। এলাকার মসজিদে ও নিয়মিত নামায পড়তে যান।
মেয়ে আর ছেলের বউ তাদের বাবার প্রিয় খাবার রান্না করে খাওয়ায়। নাতি-নাতনীদের সাথে খেলা, গল্প-সব মিলিয়ে দুই বছর আগের পারিবারিক পরিবেশ যেন ফিরে পেলেন জামাল সাহেব।

তিন মাস থাকার পর জামাল সাহেবের অবস্থার অনেকটা ভালো দেখে, সপ্তাখানেক আগে সবাই আমেরিকায় ফিরে গেল। জামাল সাহেবের খারাপ লাগলেও খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিদায় দিলেন।
এরপর বেশকিছু দিন ভালোভাবেই গেলো। মোখলেসও নিশ্চিত হলো যে, জামাল সাহেব সুস্থ হয়ে গেছেন।

কিছুদিন বেশ ভালই ছিলেন জামাল সাহেব, ইদানিং আগের মত পুরাতন জিনিসের প্রতি কেমন জানি টান অনুভব করছেন। মেজাজটা কেন জানি খুব খিটখিটে হয়ে থাকছে। ঘর থেকেও খুব একটা বের হন না। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ কেন জানি খুব ভালো লাগছে। পুরাতন বোতল, ভাঙ্গা টব, পুরাতন ফেলে দেওয়া কাপড় সব কিছুই যেন ভালো লাগার কারন হয়ে উঠেছে জামাল সাহেবের কাছে।

জীবনের শেষ সময় এই মানসিক ব্যাধি জামাল সাহেবের সব অভ্যাসের অন্তরায় কাজ করা শুরু করে। যা তার স্বাভাবিক বেঁচে থাকাকে বয়ে নিয়ে যায় জীবনের গোধূলি লগ্নে। যেখানে পূর্ণতাগুলো যেন অপ্রাপ্তির বেড়াজালে থমকে যায়।

Share This:
You might also like