বর্ষবরণ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা | নাসির উদ্দিন খোকন

 

নাসের উদ্দিন খোকন

নাসির উদ্দিন খোকন:

করোনার কারনে অন্যান্য বছরের মত এই বছরযদিও মঙ্গল শোভাযাত্রা বা বৈশাখী উদজাপন হতে পারেনি, তবে পক্ষে-বিপক্ষে লেখালেখি বা বিতর্ক থেমে নেই। মঙ্গল প্রদীপ মঙ্গল বয়ে আনেনা, মঙ্গল বয়ে আনে কর্মে। সেটা আমরা বাস্তবেই দেখতে পাই, বৈশাখী ঝড়বৃষ্টির তান্ডব সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই। তাই আয়োজকদের কাছে আমার প্রশ্ন মঙ্গল শোভাযাত্রার বা বর্ষবরণের সাথে মঙ্গল প্রদীপ, পেঁচা এবং ভুত-প্রেতের ছবির সম্পর্ক কী? এইসব অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রাসঙ্গিক কার্যকলাপের কারনে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী জাতীয় এই অনুষ্ঠানটি বর্জন করে আসছে এবং বিরোধিতাও করছে।

তাই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে সার্বজনীন করতে হলে দেশের সকল শ্রেণীর মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে এই আয়োজনের সাথে, কারন বর্তমানে যেভাবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, এতে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সম্ভ্রমশীল মানুষগুলো অংশগ্রহণ করতে বিব্রতবোধ করে, তাই সরকারি খরচে বর্ষবরণের আয়োজনে এইসব আলতু ফালতু বিষয় বাদ দিয়ে, বাংলাসন প্রবর্তনের ইতিহাস, উদ্দেশ্য এবং মৌলিক বিষয়গুলোকে তুলে ধরতে হবে। তবেই ইহা সার্বজনীন হবে। এবং যারা বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে হিন্দুদের বলছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, ভালোমতো না জেনে না বুঝে যেকোনো কিছুর বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রতিপক্ষকে খালি মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ দেয়া কোন বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু ভারতবর্ষের মুসলমানেরা সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই প্রতিপক্ষকে খালি মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ দিয়ে আসছে, বাংলা নববর্ষ পালনের ক্ষেত্রেও তাই। গতকাল অনেকে লিখেছেন বাংলা নববর্ষ নাকি হিন্দুদের উৎসব! ঐসব গর্দভগুলো জানেইনা বাংলা সনের প্রবর্তক মুসলিম শাসক সম্রাট আকবর।

একটানা প্রায় ৭০০ বছর সমগ্র ভারতবর্ষ শাসন করেছে মুসলমানেরা, ভারতবর্ষে মুসলিম সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর তারা আরবি হিজরী সন অনুসারে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।

বছরের শেষ দিন পুরাতন বছরের খাজনা পরিশোধ করে, নতুন বছরের প্রথমদিন তারা তাদের জমিজমার কাগজপত্র বুঝে নেয়া ছিল বাধ্যতামূলক, কিন্তু হিজরি চন্দ্রবর্ষ সৌরবর্ষের থেকে প্রায় এগারো দিন ছোট হওয়ার কারনে, অনেকসময় নির্দিষ্ট সময়ে প্রজারা খাজনা দিতে ব্যর্থ হয়, কার ততকালীন সময়ে প্রজাদের অর্থনীতির মূল কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। খাজনা পরিশোধ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতোনা। কৃষকদের খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে মুঘল সম্রাট আকবর চন্দ্রবর্ষ হিজরি সনকে সৌরবর্ষে রূপান্তর করেন, এবং সমগ্র ভারতবর্ষে যারযার মাতৃভাষা অনুযায়ী তার নাম দেন।

সম্রাট আকবরে আদেশ মতে তৎকালীন সময়ের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। এবং নতুন প্রবর্তিত এই সনকে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় করে তোলার জন্য বছরের শেষদিন খাজনা আদায় ও প্রথমদিন হালখাতা খোলা উপলক্ষে নানা উনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। হালখাতা এবং খাজনা আদায় করতে আসা রাজকর্মচারীদেরকে কৃষাণ কৃষাণিরা ফসল ফলাতে তাদের কত করতে হয়, তাহা বুঝানোর জন্য সামান্য ভর্তা বা কাঁচামরিচ দিয়ে পান্তাভাত খেয়ে মাঠে কাজ করার ধারনা দেয়ার জন্যই পান্তাভাতের আয়োজন করতো, কৃষকদের কষ্টের জীবনকে রাজকর্মচারীদের সামনে তুলে ধরতো সহানুভূতি পাওয়ার আশায়। এবং রাজকর্মচারীদেরকে খুশী করার জন্য প্রজারা বিভিন্ন রকম পিঠাপায়েশ সহ মৌসুমি ফলমূল ঘুষ উপঢৌকন হিসাবে দিতেন, এতেই বুঝা যায় বাঙ্গালিদের ঘুষের ইতিহাস অনেক পুরোনো।

উল্লেখ থাকে যে, আজকে আমরা যে ১৪২২ সাল বলছি, এটা কিন্তু বাংলা সনের আসল বয়স নয়, বাংলা সনের আসল বয়স হলো মাত্র ৪৬২ বছর, অর্থাৎ বাংলা সনের জন্মের দিন তার বয়স ছিল ৯০০ বছর, অর্থাৎ হিজরি সনের বয়স। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে “বঙ্গাব্দ” বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

কিন্তু ব্রিটিশরা যখন ভারতবর্ষ দখল করে, এবং মুসলমানদের থেকে ক্ষমতা নিয়ে নেয়, স্বাভাবিক ভাবেই ব্রিটিশদের উপর মুসলমানেরা ক্ষুব্ধ হয়, এই সুযোগটা হিন্দুরা কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশদের ঘনিষ্ঠ হয়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে থাকে, ব্রিটিশরাও তাদের ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করার জন্য সংখ্যা গরিষ্ঠ হিন্দুদের সাথে হাত মেলিয়ে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করতে থাকে, হিন্দুরাও ব্রিটিশদের খুশি করার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করতে থাকে, এরি মাঝে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৭ সালে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর বৈশাখ মাসের প্রথম দিন কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করে। এতে ব্রিটিশরা খুশি হয়ে প্রত্যেক বছর এই দিনটি পালনে উৎসাহ যোগায়।

হিন্দুরাও সুযোগটি লুফে নেয়, সুযোগ পায় সরকারের আরো কাছে আসার, তাই সরকারি সুযোগ সুবিধা নিয়ে চৈত্র মাস জুড়েই চলতে থাকে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি বা মহাবিষুব সংক্রান্তির দিন পালিত হয় গাজন উৎসব উপলক্ষ্যে চড়ক পূজা অর্থাৎ শিবের উপাসনা। নিজেদের পুজাও হয়ে গেলো অর্থাৎ ইশ্বরও খুশি হলো সরকারও খুশি হলো। একেই বলে এক ঢিলে দুই পাখী, পুজার খরচও সরকার থেকে।

এভাবেই ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু তথা অন্যান্য সব ধর্মের লোকেরা লাভবান হলেও, মুসলমানেরা হয়েছে লাঞ্ছিত বঞ্চিত, যার ফলে বিশাল ভারত হিন্দুদের দিয়ে গেলো, মুসলিম শাসিত আরকান বার্মাকে দিয়ে গেলো, মুসলিম শাসিত কাশ্মীরকে দিখন্ডিত করে গেলো। এইসবি মুসলমানদের না বুঝে সবকিছুতে বিরোধীতার ফল।

*লেখক: নাসির উদ্দিন খোকন

কলামিস্ট এবং সাধারণ সম্পাদক ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ফোরাম (IMF)

Share This:
You might also like