এই তালেবান আসলে কারা? এত দ্রুত তাদের সফলতার কারণই বা কী?

Bangla Times Desk:  পশতু ভাষায় তালেবান মানে হচ্ছে ‘ছাত্র’। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন আফগানিস্তানের দখল ছেড়ে যায়, তখন উত্তর পাকিস্তানে এই তালেবান আন্দোলনের জন্ম হয়। এর পেছনে আমেরিকান সহায়তা ছিল বলে প্রচার রয়েছে। এই আন্দোলনে মূলত পশতুন অর্থাৎ পশতুভাষীদের প্রাধান্য ছিল। ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বরে তালেবানরা ইরান সীমান্তবর্তী আফগান প্রদেশ হেরাত দখল করে নেয়। আর এর ঠিক এক বছর পর তারা আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখল করে। তারা প্রেসিডেন্ট বুরহানউদ্দীন রাব্বানির সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে নিজেদের সরকার প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯৮ সাল নাগাদ তালেবান আফগানিস্তানের প্রায় ৯০ শতাংশ অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু ২০০১ সালে আমেরিকায় টুইন টাওয়ার ধংসের পরেই ঘটে যত বিপত্তি। টুইন টাওয়ারে হামলার জন্য আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র, আর সেই লাদেন নাকি লুকিয়ে আছে আফগানিস্তানের পাহাড়ে। যুক্তরাষ্ট্র শুরু করে ‘ওয়ার অন টেরর’, ব্যাপক বোমা হামলা চালায় আফগানিস্তানে, সেখানে ক্ষমতায় ছিল তালেবান। তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করে বহুজাতিক বাহিনী ঢোকায় যুক্তরাষ্ট্র, বসায় পুতুল সরকার। অবস্থা বেগতিক দেখে তালেবানরা সড়ে পরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

এই ২০ বছরে আমেরিকা আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠিয়েছে হাজার হাজার, আড়াই ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে আড়াই লক্ষ মানুষ নিহত হয়, নিজেদের আড়াই হাজার সৈণ্যও হারায়। কিন্তু এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ, এবং হাজার হাজার সৈন্য বিরূপ আবহাওয়ায় রেখে প্রতিদিন লোকক্ষয় ছাড়া আর কী অর্জন তা নিয়ে মার্কিনীরা নিজেরাই সন্দিহান হয়ে পড়ে। আফগানিস্তান ছেড়ে আসার জন্য অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়তে থাকে। বছর চারেক আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাস্পই প্রথম আফগান ছাড়ার ঘোষণা দেন। ২০১৮ সাল থেকে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আলোচনা চলতে থাকে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারীতে কাতারের রাজধানী দোহায় দুই পক্ষের মধ্যে যে শান্তি চুক্তি হয়, তার শর্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করবে এবং তালেবানও আর মার্কিন বাহিনীর ওপর কোন হামলা চালাবে না। চুক্তির আরও শর্তের মধ্যে ছিল তালেবান আর আল কায়েদা কিংবা অন্য কোন জঙ্গী সংগঠনকে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আশ্রয় দেবে না এবং আফগান শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাবে।

নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালের এপ্রিলে ঘোষণা করেন, ১১ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব মার্কিন সেনা আফগানিস্তান ছেড়ে যাবে। আর আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারের খবরের পরপরই আফগানিস্তানের চারিদিকে তালেবানের জয়-জয়কার শুরু হয়। প্রতিদিনই তারা আফগানিস্তান জুড়ে শহর-বন্দর-গ্রামে হামলা চালাচ্ছে, দখল করে নিচ্ছে আফগান সরকারের সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি। ২ জুলাই গুরুত্বপূর্ণ বাগরাম ঘাটি ছেড়ে যায় মার্কিন বাহিনী, দখলে নেয় তালেবান। একে একে পতন ঘটতে থাকে প্রাদেশিক রাজধানীগুলির। ৮ আগস্ট একই দিনে তিনটি প্রাদেশিক রাজধানী দখলে নেয় তালেবান। ১২ আগস্ট দখলে নেয় গুরুত্বপূর্ন নগরী হেরাত, কান্দাহার, এবং গজনী। ১৫ আগস্ট কাবুল অভিযানের আগেই সকল প্রাদেশিক রাজধানী ও বড় বড় শহর দখলে আসে তালেবানের।

প্রশ্ন হলো, আমেরিকান অস্ত্রে সজ্জিত আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যা তিন লাখের মতো। বিমান বাহিনীও রয়েছে তাদের। অন্যদিকে তালেবান যোদ্ধার সংখ্যা ৬০ থেকে ৮০ হাজারের মতো, তাদের কোনও ইউনিফর্ম নেই, বেশিরভাগহ যোদ্ধার পায়ে জুতো পর্যন্ত নেই, বিমান সাপোর্ট তো নেইই। তারপরেও তালেবান কিভাবে এত দ্রুত বিজয় অর্জন করছে। অধিকাংশ পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষক বর্তমান অবস্থা দেখে বলছেন, ন্যাটো বাহিনী তালেবানের তেমন কোনও ক্ষতি তো করতে পারেইনি, বরঞ্চ গত ২০ বছরের মধ্যে তালেবান এখন সবচেয়ে শক্তিধর। গত ১০ বছর ধরে এই কৌশল নিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়েছে তালেবান। “তারা জানতো, আমেরিকা এক সময় আফগানিস্তান ছাড়বেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা করছিল তারা।” তারা সময় বুঝে হামলা চালিয়েছে।

তবে কেবল হামলা করে গোটা দেশ দখল করেনি তালেবান। মুলত আলাপ আলোচনা এবং নেগোসিয়েশন করেই একেকটি এলাকা তারা দখলে নিয়েছে। এর মূল কারণ তালেবানের ব্যাপক গণভিত্তি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ও প্রশাসনে তালেবান সমর্থিতরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। আর এই ভিতটা এতই মজবুত ছিল যে ঘরে ঘরে, অফিসে আদালতে, স্থানীয় সরকারে, এমনকি আফগান বাহিনীতেও তালেবানের উপস্থিতি ছিল। ফলে বিভিন্ন এলাকার কামান্ডাররা এবং স্থানীয় প্রশাসকরা আলোচনার ভিত্তিতে তালেবানের কতৃত্ব মেনে নেয়। যুদ্ধ ছাড়া শান্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করার সুযোগ হাতছাড়া করেনি আফগানবাসীরা। তাছাড়া প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি যে ভারত-আমেরিকার পুতুল সরকার, তা জানতো এবং তার প্রতি আস্থাও ছিল না আফগানদের। মুলত ব্যাপক গণভিত্তির উপর ভর করেই তালেবানের এ কৌশলগত বিজয়।

তবে ২০ বছর আগে তালেবান আর বর্তমান তালেবান এক জিনিষ নয়। বর্তমানের তালেবান অনেক আধুনিক, স্মার্ট এবং অতীদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগেভাগেই ঘোষণা করেছে, আগেকার তালেবান শাসনের মত এবারে তারা নারীদের শিক্ষায় বাধা দিবে না, তাদের চাকরি এবং বাইরে যাওয়ায় কোনো বাধা থাকবে না, প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মতো শাস্তি থেকে তারা সরে আসবে। তবে আফগানিস্তানকে তারা ইসলামিক আমিরাত ঘোষণা করবে, এবং শরীয়া আইন চালু করবে। এখন দেখা যাক, তারা কিভাবে জনগনের ম্যান্ডেট লাভ করে, আর শরীয়া আইনকে কিভাবে যুযোপযোগি করে সমালোচনাবিহীন ভাবে কার্যকর করতে পারে। তবে সম্ভাব্য আফগান প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন তালেবান প্রধান আমির আল মুমিনিন হাইবাতুল্লাহ আখুনজাদা, যিনি নিজে সাবেক প্রধান বিচারপতি।

Share This:
You might also like