করোনায় কেমন কাটছে প্রবাসী শ্রমিকদের দিনকাল?

প্রকাশিত: ৬:১১ অপরাহ্ণ, মে ২২, ২০২০

যখন এই লেখাটা লিখছি,তার ঠিক ২৪ ঘন্টা অাগে কুয়েতে এক বাংলাদেশী শ্রমিক পাচতলা থেকে লাফিয়ে অাত্বহত্যা করেন।

কুয়েতে ১২ দিন যাবৎ কারফিউ চলছে। ফলে অবরুদ্ধ জীবনযাপন করছেন বাংলাদেশী শ্রমিকরা।করোনায় শ্রমিকদের কাজ নেই, অনেকেই বকেয়া বেতন এখনও পাননি। অর্ধাহারে- অনাহারে দিন কাটিয়ে বেশিরভাগ শ্রমিকই এখন গৃহবন্দী। দেশে অাত্বীয় স্বজনরা তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, অনেক প্রবাসীরই দেশেও মা- বাবা, স্ত্রী- সন্তান,পরিবার- পরিজন ভাল নেই। অনেকেই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অাত্বহত্যা করেন।কুয়েতের সেই অাত্বহত্যাকারী শ্রমিক তাদেরই একজন।

অথচ ১ মাস পূর্বে বাংলাদেশ সরকার প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য খাবার পাঠিয়েছেন, কুয়েত, বাহরাইন, মালয়োশিয়া, মালদ্বীপ সহ কিছু দেশে। কিন্তু দুতাবাসগুলোতে যোগাযোগ করে শ্রমিকরা খাবার পাননি। দুতাবাস থেকে প্রবাসী শ্রমিকদের কোনরুপ সাহায্য সহযোগিতা করা হয়না।

উপরন্তু মালয়োশিয়ায় বাংলাদেশী এক শ্রমিক খাবারের জন্য বাংলাদেশ দুতাবাসে ফোন করলে, দুতাবাসের কর্মকর্তা বলেন খাবার নাই! এভাবে ফোন করে কি খাবার পাওয়া যায় না কি? জবাবে শ্রমিক বলেন, খাবার তো অবশ্যই অাছে। অাপনারা এখনও পর্যন্ত কোন শ্রমিককে খাবার দেননি! তাহলে খাবার গেল কই?এভাবেইদুজনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে ফোন কল শেষ হয়।শ্রমিকরা হতাশ হন।

অাইনী- সহায়তা, দুর্ঘটনায় ইন্সুরেন্স ক্লেইম করে শ্রমিককে ক্ষতিপুরন প্রদান, শ্রমিকের ন্যায্য বেতন অাদায়ে কোম্পানিগুলোর সাথে অালোচনা, সর্বোপরি প্রবাসে শ্রমিকদের জীবনমান- স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে দুতাবাসগুলো শ্রমিকের পাশে থাকেন না। সাহায্য- সহযোগিতা কাগজ কলমেই পড়ে থাকে। শ্রমিকদের সাথে দুতাবাসের কোন সম্পর্ক না থাকায় কর্মকর্তারা নিজেও জানেন না, শ্রমিকদের প্রকৃত সংকট কি কি? কিভাবে বিদেশের মাটিতে বসে তাদের স্বার্থলংঘন হচ্ছে।

কাতারে অবস্থানরত এক প্রবাসী বন্ধুর সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল।কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন……. অামরা ১০ জন এক বাসায় অাছি। কারো কোন কাজ নেই। লকডাউনে সবাই গৃহবন্দী। এরই মধ্যে কাতার সরকার ঘোষনা দিয়েছে প্রত্যেক রুমে বাঙালিরা ৪ জনের বেশি থাকতে পারবেনা।

কিন্তু সকলেরই কাজ না থাকায় অার্থিক সংকটে ভুগছেন।এর মধ্যে একেক বাসায় ৪ জন থাকতে গেলে অতিরিক্ত বাসা ভাড়া তারা দিতে পারবেনা। অাশেপাশের কিছু বাসা করোনা সংক্রমনে লকডাউনে অাছে। কাজে বের হতেও অনেকেই সাহস পাচ্ছেননা। চারপাশে অনিশ্চিত, অাতংকিত পরিবেশ। কিন্তু কাতারে অবস্থিত বাংলাদেশ দুতাবাসের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কর্তৃপক্ষ অামলে নেয়নি। বৈশ্বিক মহামারীতে পুরো পৃথীবি যখন স্থবির,তখন দেশে দেশে বাংলাদেশী শ্রমিকদের পাশে দাড়ানো উচিত দুতাবাসগুলোর।তিনি এমনটাই দাবী করেন।

কুয়েত, কাতার, ওমান, সৌদি আরব, বাহরাইন, লেবানন, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, লিবিয়া, ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবস্থা অনেকটাই শোচনীয়।এসব রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বরাবরই অাক্ষেপ ও অভিযোগ রয়েছে দুতাবাসগুলো থেকে কর্মকর্তারা কখনই বের হননা। কখনই শ্রমিকদের পাশে এসে দাড়ান না। দুতাবাসে ফোন,মেসেজ,ইমেইল করেও তারা কোন সাড়া পাননা। এমনটাই দাবী করেছেন মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বেশকিছু শ্রমিক।

করোনা মোকাবিলায় দেশীয় পোশাক খাত, মাঝারি শিল্প, অন্যান্য ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে অার্থিক প্রনোদনার অাওতায় এনে বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখা গুরুত্বপূর্ন একটি অংশ রেমিট্যান্স যোদ্ধারা কোন রাষ্ট্রীয় প্রনোদনা পাচ্ছেননা।

কিন্তু এই প্রবাসী শ্রমিকরা প্রবাসে ও দেশে বিভিন্নভাবে থাকেন উপেক্ষিত ও অবহেলিত। রাষ্ট্রীয় দুতাবাস, কাস্টমস, এয়ারপোর্টে এদেরকে নুন্যতম নাগরিকের মর্যাদাও দেওয়া হয়না অনেক সময়। উচ্চশিক্ষিত, দামী পোশাকে সুসজ্জিত বড় বড় অফিসাররা ভুলে যান যে,

প্রবাসী শ্রমিকদের আয়েই রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ। সদ্য সমাপ্ত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবাসীরা যে পরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে এত পরিমাণ প্রবাসী আয় আগে কখনো আসেনি। গত জুন মাসে প্রবাসীরা ১৩৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার পাঠায়। ফলে গত অর্থবছরে প্রবাসী আয় বেড়ে হয় ১ হাজার ৬৪২ কোটি ডলার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

গত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি আয় আসে মে মাসে। ওই মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিল ১৭৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৪ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। এদিকে বিপুল পরিমাণ প্রবাসী আয় আসার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ২৫৭ কোটি ডলার।

করোনার প্রভাব প্রবাসী শ্রমিকদের উপর পড়েছে প্রচন্ডভাবে।লন্ডভন্ড হয়ে গেছে অনেকের জীবন। রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট দুতাবাসগুলোর উচিত অন্তত এই মহামারীতে শ্রমিকরা যাতে একটু সরকারি সেবা পায়,সেদিকে নজর দেওয়া। এটা সকল প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার।

লিখেছেন : আব্দুর রহমান


আরও পড়ুন