Home / খেলা / সবসময়ের পয়া ভেন্যু ইংল্যান্ডে সাফল্যের প্রত্যাশা

সবসময়ের পয়া ভেন্যু ইংল্যান্ডে সাফল্যের প্রত্যাশা

অরণ্য আলভী তন্ময় : ইংল্যান্ডেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলেছিল বাংলাদেশ। এবার সেই দেশেই ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বসেরার আসরে খেলার অপেক্ষায় রয়েছে লাল সবুজ প্রতিনিধিরা। এর আগে লন্ডনের পথে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাংলাদেশ বিমানের বিজি ০০০১ ফ্লাইটটি তখন ইরানের আকাশে। বিকট গর্জনে সাদা-কালো মেঘ ভেদ করে গন্তব্যে এগিয়ে চলেছে আমাদের উড়ান। সিটের সামনে থ্রিডি ম্যাপ দেখাচ্ছিল হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করতে আরো সাড়ে ৭ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগবে। অন বোর্ড প্রায় সবারই বোরিং সময় কাটছে। ব্যতিক্রম ছিলাম না আমরা বিশ্বকাপের সংবাদ সংগ্রহে বাংলাদেশ থেকে উড়াল দেওয়া তিন সংবাদকর্মীও। সাড়ে ১০ ঘণ্টার মাত্র ৩ ঘণ্টা কাটিয়েছি, বাদ বাকি সময় কাটবে কী করে? নিজেদের মধ্যে কথায়, আড্ডায় কতক্ষণই বা কাটানো যায়? তাছাড়া বিমান টেক অফের পর থেকেই তো আড্ডা দিচ্ছি। আর কত? ক্রমশই যেন বিমানে সময়গুলো বিবর্ণ ও অসহনীয় হয়ে উঠছিল, অপেক্ষা বাড়ছিল গন্তব্যের। ঠিক সেই মুহূর্তে বিজনেস ক্লাস ছেড়ে আমাদের ইকোনমি ক্লাসে হাজির বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন। হাবিবুল বাশার মূলত ইংল্যান্ডে যাচ্ছেন বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পর্যবেক্ষক হিসেবে। প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ১৪ জুন এলে তিনি দেশে ফিরে যাবেন। হাবিবুল বাশার স্বভাবই উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত। অপেক্ষাকৃত নিচু স্বরে হাসিমাখা মুখে মজার মজার কথায় আড্ডা মাতিয়ে তুলতে তার জুরি মেলা ভার। সেই তিনিই আমাদের ‘সময় যেন কাটে না’ মুহূর্তে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। তার প্রাণবন্ত আড্ডায় বর্ণিল হয়ে উঠল আমাদের বিবর্ণ সময়। আড্ডার এক ফাঁকে কিছুটা সিরিয়াস হয়ে বলি, চলেন বিশ্বকাপ নিয়ে আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলা যাক। একটু থেমে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, এখনই? বললাম, হ্যাঁ। কেন আপত্তি আছে? পাল্টা প্রশ্ন শুনে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, না না। বলেন কী প্রশ্ন? আমার প্রশ্ন ছিল, সেই ইংল্যান্ডে এবার বিশ্বকাপের আসর বসতে যাচ্ছে, যেখানে ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশ নিজেদের দাপুটে আগমনীর জানান দিয়েছিল। এবার কী হতে যাচ্ছে?

বাংলাদেশকে দুহাত ভরে দেওয়া ইংল্যান্ড এবারও অভাবনীয় কিছু উপহার দেবে? দ্বিমত পোষণ করলেন না সুমন, ‘দেখুন কোনো একটা কারণে বাংলাদেশ যখনই ইংল্যান্ডে আসে, ভালো খেলে। আমাদের ইংল্যান্ডের স্মৃতি সবসময়ই মধুর। ১৯৮৯ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দলর হয়ে খেলতে এসেছিলাম। ওই সফরে কিন্তু ভালো করেছিলাম। অথচ ভালো করার কথা না। একদম আলাদা কন্ডিশন, আলাদা উইকেট। কিন্তু আমরা খুব ভালো খেলেছিলাম। এরপর থেকে বাংলাদেশ যখনই সেখানে খেলেছে, খারাপ কিন্তু খেলেনি কখনো।’ ‘১৯৯৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খুবই ভালো খেলেছে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খুব ভালো খেলেছে। ২০০৫ সালে কিন্তু আমাদের খুব ভালো একটা স্মৃতি আছে, তখনকার অজেয় অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিলাম। তো কারণটা ঠিক জানি না। বাংলাদেশ সত্যিই ইংল্যান্ডে ভালো খেলে। আমি আশা করব যে এই ধারাটা আমরা বজায় রাখবো। আর এবার মনে হয় অতীতে যত দল নিয়ে এসেছিলাম, তার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ও পারফর্মার দল নিয়ে যাচ্ছি। ভালো কিছুর আশা তো করতেই পারি। আগে ইংল্যান্ডে যতগুলো টুর্নামেন্ট খেলেছি তার থেকে এবার ভালো করবো।’ বলে যান হাবিবুল। নির্বাচক হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে সুমন যতটা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান এদেশের হাতে গোনা আর মাত্র কয়েক জন মানুষ অনন্য সেই সুযোগটি পেয়ে থাকেন। তার আলোকেই হয়তো বিশ্বকাপে মাশরাফিদের নিয়ে এমন স্বপ্ন বুনতে শুরু করে দিয়েছেন ‘মিস্টার ফিফটি’। প্রিয় নির্বাচকের এই স্বপ্নকে মাশরাফিরা ভেঙে চুরমার করে দেবেন নাকি বাস্তবে রূপ দিয়ে আরেকবার গগন বিদারী গর্জনে ক্রিকেট বিশ্বকে কাঁপিয়ে তুলবেন, সেটাই দেখার বিষয়। ২০০৬ এর শেষ দিকে অভিষেক হওয়া সাকিব এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। ২০০৭ এ যখন প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন তখন সবেমাত্র আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার হাতেখড়ি হয়েছে। তবে অল্প দিনের মাথায় বিশ্বে জানান দিয়েছিলেন নিজের আগমনী বার্তা। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের মাত্র আড়াই বছরের মাথায় বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডারের মুকুটটি পরে বসেন সদম্ভে।
সেই যে এক নম্বর আসনে বসেছেন, এরপর ওঠা-নামা হলেও বলা যায় দীর্ঘদিন ধরে সেই রাজত্বের দাবিদার সাকিব একাই। দুই একবার শীর্ষ স্থান হারালেও অল্প দিনের মাথায় আবার ঠিকই ছিনিয়ে নিয়েছেন। যেন রাজা ফিরেছেন সিংহাসনে। ২০১১ সালে নিজের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ আসার আগেই জানান দেন তিনি কতটা কার্যকরী। ব্যাট-বলে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে থাকেন। নিজের দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে এক নম্বর অবস্থানে থেকেই দলকে নেতৃত্ব দেন সেবার। ২০১৫ বিশ্বকাপেও তাই। এর মাঝে একবার দুইয়ে নেমে আসলেও বিশ্বকাপের অনেক আগেই আইসিসি ওয়ানডে র‍্যাংকিংয়ের এক নম্বর অলরাউন্ডারের জায়গাটি পুনরুদ্ধার করে নিয়েছিলেন। তবে মনে হচ্ছিল ২০১৯ বিশ্বকাপটা এক নম্বরে থেকে আর শুরু করা হবে না তার। ইনজুরির কারণে বেশ কয়েকটা ম্যাচ খেলতে পারেননি। তাতে র‌্যাংকিংয়ে এক নম্বরে চলে আসার সুযোগটা কাজে লাগিয়েছিলেন আফগানিস্তানের রশিদ খান। আফগান তারকার কাছে ওয়ানডের শীর্ষ স্থান হারালেও বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ আগে তা ফিরে পান টাইগার সহ-অধিনায়ক সাকিব। ২২ মে প্রকাশিত আইসিসির নতুন র‍্যাংকিংয়ে রশিদ খানকে পেছনে ফেলে আবার শীর্ষস্থান দখল করে বসেন। এরই মধ্য দিয়ে রেকর্ড বুকে নতুন একটি রেকর্ড স্থাপন করতে যাচ্ছেন এই বাঁহাতি। প্রথম কোনো অলরাউন্ডার হিসেবে টানা তিন বিশ্বকাপ র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ অবস্থানে থেকে খেলতে যাচ্ছেন সাকিব। এর আগে কোনো ক্রিকেটারই এমন কীর্তিতে নাম লেখাতে পারেননি। তিন বিশ্বকাপ মিলে সাকিব খেলেছেন ২১টি ম্যাচ। তাতে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ও উইকেট শিকারি উভয়ই নাম্বার ওয়ান নিজেই। বিশ্বকাপের ২১ ম্যাচে নিয়েছেন ২৩ উইকেট আর ব্যাট হাতে করেছেন ৫৪০ রান। মজার বিষয় হচ্ছে বিগত বিশ্বকাপগুলোতে অলরাউন্ডার র‍্যাংকিংয়ে সাকিবের আশেপাশে যারা ছিলেন তারা কেউই পরেরবার সে জায়গায় থাকতে পারেনি। শীর্ষ তালিকায় কেবল টিকে আছেন সাকিবই।
২০১১ বিশ্বকাপে সাকিবের শক্ত প্রতিপক্ষ ছিলেন যুবরাজ সিং, শেন ওয়াটসন, জেমস ফ্র্যাঙ্কলিন, ড্যানিয়েল ভেটোরি এবং আব্দুর রাজ্জাকের। ২০১৫ আসরে প্রতিযোগী বদলে সাকিবের আশে পাশে ছিলেন তিলকারতেœ দিলশান, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস, মোহাম্মদ হাফিজ এবং জেমস ফকনার এর মতো খেলোয়াড়রা। অথচ তাদের বেশিরভাগই অবসর নিয়েছেন, এই বিশ্বকাপে খেলবেন কেবল হাফিজ আর ম্যাথিউস। তবে এই আসরে তারা সাকিবের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে র‍্যাংকিং এবং পারফরম্যান্সের বিচারে। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের আগে সাকিবের থেকে খানিকটা এগিয়ে ছিলেন আফগানিস্তÍানের তরুণ সেনসেশন রশিদ খান। ত্রিদেশীয় সিরিজে তিন ইনিংস খেলে ১৪০ করার পাশাপাশি বোলিংয়ে দুই উইকেট শিকার করেন সাকিব। এই সিরিজে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে রশিদ খানের থেকে ২০ পয়েন্ট এগিয়ে যান টাইগার তারকা। বর্তমানে সাকিবের রেটিং পয়েন্ট ৩৫৯ আর রশিদের ৩৩৯ পয়েন্ট। ৩১৯ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছেন আরেক আফগান স্পিন বোলিং অলরাউন্ডার মোহাম্মদ নবী। তাই বলা যায়, র‍্যাংকিংয়ে থাকা খেলোয়াড়রা পরিবর্তন হয়েছেন সবাই, কেবল সাকিবই একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছেন প্রায় এক যুগ ধরে। টানা তিন বিশ্বকাপে সেরার মুকুট মাথায় নিয়ে নামাটা চাট্টিখানি কথা নয়, তাই ভক্তদের আশাও যেন আকাশচুম্বী মাগুরার সন্তানকে ঘিরে। এখন দেখার পালা সেই আশার চাপ সামলে কতটা জ্বলে উঠতে পারেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রাণ। পয়া ভেন্যু ইংল্যান্ডে আবারো হাসবে সাকিব আল হাসানের ব্যাট-বল দুটোই এই প্রত্যাশা ক্রিকেটপ্রেমীদের।

About admin

Check Also

পেনাল্টি মিসের পরে ম্যান ইউনাইটেড পোগবাকে অনলাইন বর্ণবাদী নির্যাতনের নিন্দা জানায়   >> রয়টার্স

দি বাংলা টাইমস ডেস্ক: মঙ্গলবার ওলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারারসে মিডফিল্ডার পেনাল্টিটি মিস করার পরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড পল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *